All for Joomla The Word of Web Design
অন্যান্য

তাবলীগের সাথীদের উদ্দেশ্যে মাওলানা ইবরাহিম দেওলা সাহেবের চিঠি

আব্দুল্লাহ আল ফারুক

ফাযেলে দারুল উলূম দেওবন্দ

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
১২.৮.২০১৬ তারিখ সন্ধ্যায় অধমের বাংলেওয়ালি মসজিদ মারকাযে নিযামুদ্দিন থেকে গুজরাট প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে এ সময় নানা ধরনের গুজব বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। যা পরিপূর্ণ মিথ্যা ও অবাস্তব। এজন্যে মনে হলো, আমি নিজেই যদি মূল বাস্তবতা তুলে ধরি, সেটাই সমীচীন হবে।
১.
এ বছর ২০১৬ এর মাহে রমাযান থেকে অদ্যাবিধ বাংলেওয়ালি মসজিদ মারকাযে নিযামুদ্দিনে যেসব ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েক দিন পূর্বে খোদ আমার উপস্থিতিতে যে ঘটনাটি ঘটেছে, এমন অসমীচীন ঘটনাগুলোর কারণে এই মুবারক মেহনতের হুলিয়া বিকৃত হয়ে গেছে। বছরের পর বছর মেহনতের মাধ্যমে অর্জিত পবিত্রতা পদদলিত হয়েছে। যার কারণে গোটা দুনিয়ার মেহনতের সাথী, আল্লাহওয়ালা উলামায়ে কেরাম ও শ্রদ্ধেয় বুযুর্গানে দ্বীন খবুই মর্মাহত ও দুশ্চিন্ত্রগ্রস্থ। বর্তমান চালচিত্রের কারণে একদিকে মেহনতের ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। অন্যদিকে বাংলেওয়ালি মসজিদের মাঝে এমন একটি গোষ্ঠী জেঁকে বসেছে, যারা বরাবরই ভুল কথাগুলোকে সঠিক প্রমাণিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সংশোধনের সহায়ক কোনো পদক্ষেপ কেউ নিলে ওরাই তার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাবলীগের মেহনতের জন্যে এটি খুবই বিপদজনক ও ভয়াবহ চালচিত্র। এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে দূরদর্শিতার সঙ্গে। যেসব লোক মনে করে, এ মুহূর্তে মারকাযে কোনো সমস্যা নেই। কাজ তার নিজস্ব গতিতে চলছে, তার নির্জলা মিথ্যা ও অবাস্তব কথা বলছে।
২.
এ বছর ঈদুল ফিতরের পর আমি মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলেওয়ালি মসজিদে যাওয়ার নিয়ত করি। যাওয়ার পূর্বে আমার মনে হয়েছিলো, ইনশাআল্লাহ, খুবই দ্রুত আমরা পারস্পরিক বোঝাবুঝির মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যাবলির সমাধানে উপনীত হতে পারবো। সেই ভাবনা থেকেই আমি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকবার মৌলভি সাদ সাহেবের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, কোনো ফলপ্রসু পরিণতি বের করতে পারিনি। বরং আমার নিযামুদ্দিনে অবস্থান ও প্রতিদিনের মাশওয়ারায় উপস্থিত হওয়ার সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে এ কথা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিলো যে, আমি কাজের বর্তমান তরতিব ও পদ্ধতির সমর্থক। এটাই যখন বর্তমানের চিত্র, তখন আমি যদি এ বিষয়ে আমার অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি সবার সামনে তুলে না ধরি তাহলে তা দ্বীনের ক্ষেত্রে অন্যের লেজুড়বৃত্তির নামান্তর হবে। এ কারণে আমি নিম্ন সারা দুনিয়ার সাথীদের সামনে আমার নিজের অবস্থা পরিষ্কার শব্দে তুলে ধরছি―
বর্তমান সময়ে দাওয়াতের এই মুবারক মেহনতের পরিধি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ এ কাজের সঙ্গে নিজেকে জুড়ে নিয়েছে। বিভিন্ন মানসিকতা ও বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ এই মেহনতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। কাজেই এ কথা সূর্যের মতো পরিষ্কার যে, এতো সুবিস্তৃত ও ব্যাপক কাজের দায়িত্ব বহন করার জন্যে প্রয়োজন এমন একটি নির্ভরযোগ্য জামাত― যার সদস্যগণ পূর্ববর্তী বুযুর্গদের সংশ্রবে জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছেন, যাদের তাকওয়া, বিশ্বস্ততা, কাজের জন্যে নিজেকে একনিষ্ঠভাবে নিবেদন ও আত্মসমর্পণ, লিল্লাহিয়্যাত, মেহনত ও মুজাহাদার গুণাবলির ওপর সবাই একমত। এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী জামাত পারস্পরিক পরামর্শ ও একতার সঙ্গে কাজটিকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন। এগুলো ব্যতিরেকে এই মুবারক মেহনতটিকে সঠিক গন্তব্যের ওপর রাখা মুশকিল হয়ে যাবে এবং সমগ্র দুনিয়ার মেহনতের সাথীদের মাঝে ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এজন্যেই হযরত মাওলানা যুবাইরুল হাসান সাহেব রহ. এর জীবদ্দশাতেই বেশ কিছু অতীব গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সামনে চলে আসায় কয়েকবার হজরতজি মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহেব রহ. কর্তৃক গঠিত শূরার মাঝে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কয়েকজন সদস্যকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা পেশ করা হয়েছিলো। তখন এ দরখাস্ত পেশ করা হয়েছিলা যে, আগামীর ঘটিতব্য বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এর মাঝেই নিহিত। জীবনসায়াহ্নে হযরত মরহুম এর জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুতও হয়েছিলেন। কিন্তু অকস্মাৎ তাঁর আখেরাতের ডাক এসে পড়ে। মহান আল্লাহ তাঁকে মাগফিরাত দান করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
হযরত রহ. এর ইনতিকালের পর আমরা পুরনো সাথীদের মাশওয়ারায় একটি বিশদ বিবরণ সম্বলিত চিঠি মৌলভি সাদ সাহেব বরাবর প্রেরণ করেছিলাম। ওই চিঠির মাঝে মেহনতের বর্তমান তরতিব ও পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের মনোকষ্ট ও দুঃশ্চিন্তার কথা তুলে ধরেছিলাম। উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্যে শূরা কায়েম করার কথাও বলেছিলাম। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের সেই উদ্যোগের কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। মেহনতের ক্রমশ বিপর্যয় ঘটতে থাকে।
এর কিছু দিন পর গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ এর নভেম্বর মাসে দুনিয়ার পুরনো সাথীদের উপস্থিতিতে শূরার শূন্যপদগুলো পূরণ করা হয়। তখন আমি পুনরায় মৌলভি সাদ সাহেবের সঙ্গে কথা বলি যে, আপনি এই শূরা মেনে নিন। ইনশাআল্লাহ, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তা মানতে অসম্মতি জানান। যার ফলে গোটা দুনিয়াতে তাবলীগের মেহনতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে। এখনো আমার মতে যাবতীয় সমস্যার একটাই সমাধান যে, সেই শূরা মেনে নেওয়া হোক এবং মেহনতের যাবতীয় চাহিদা শূরার সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পূরণ করা হোক।
কাজের তরতিব ও পদ্ধতির ব্যাপারে আমার অভিমত হলো, বিগত তিন হযরতের যুগে যেই বিষয়গুলো সর্বসম্মতিক্রমে চূড়ান্ত, সেগুলোকে নিজ আসল সুরতের ওপর বহাল রাখা হোক। যদি সেগুলোর মাঝে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংযোজনের প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে তা শূরার সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নেয়া হোক। বর্তমান সময়ে ঐক্যের দেয়ালে ফাটল ধরার সবচেয়ে বড় কারণ হলো, শূরা ও পুরনো সাথীদের মাশওয়ারা ও আস্থা ছাড়াই নতুন কিছু তরতিব ও বিষয় যুক্ত করা হয়েছে ।
দ্বীন ও শরিয়াহর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই তাবলীগি জামাত জমহুর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের শতভাগ অনুসারী। কুরআন কারিমের যেকোনো আয়াতের তাফসীরের ক্ষেত্রে আমরা জমহুর মুফাসসিরিন, যেকোনো হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জমহুর মুহাদ্দিসিন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ থেকে ইসতিমবাত ও ইসতিখরাজ তথা শিক্ষা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও আমরা জমহুর ফুকাহায়ে কেরামের অভিমতের শতভাগ অনুসারী। অতীতের তিন যুগে আমাদের বড়গণ এমনই ছিলেন। কারণ, এর বাইরে গেলে দ্বীনের ক্ষেত্রে তাহরিফ তথা বিকৃতির দুয়ার খুলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
দাওয়াতের এই মেহনতে শুরু থেকেই বয়ানের ক্ষেত্রে সতর্ক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। অনির্ভরযোগ্য কথা, ইজতিহাদ ও ভুল দলিল থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্যেই নির্দেশ দেওয়া হতো যে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ বয়ান ছয় সিফাতের সীমারেখার ভেতর রাখবে। কোনো আয়াত বা হাদীসের ব্যাখ্যা করতে হলে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের সূত্রে বলতে হবে। বড়গণ সবসময় প্রতিবাদ, ছিদ্রান্বেষণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আকাইদ, মাসাইল ও বর্তমান পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতেন। এই মেহনতের অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উসুল হলো, কোনো দ্বীনি জামাত বা সদস্যের সমালোচনা ও নিরীক্ষণ করা যাবে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক সাথী; এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যিম্মাদারকে দেখা যাচ্ছে, তারা নিজ বয়ানের মাঝে এতোদিনের সীমারেখা ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষত সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ থেকে ভুল দলিল দেওয়া হচ্ছে। প্রায়সময় দ্বীনের বিভিন্ন সংগঠন ও ঘারানার সমালোচনা ও ছিদ্রান্বেষণ হচ্ছে।
তাদের এহেন কর্মকান্ডর ওপর আমি অধম শুরু থেকেই সন্তুষ্ট ছিলাম না। অসংখ্যবার বিষয়টির ওপর তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টাও করেছি। আমার নিজের বয়ানের মাঝেও ইতিবাচকভাবে সতর্ক করার চেষ্টা নিয়মিত করে এসেছি।
কিন্তু যখন দেখলাম, তাদের সেই আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলেওয়ালি মসজিদে আমার অবস্থানকে জড়িয়ে কিছু লোক ভুল মতলব ছড়াচ্ছে যে, কাজের বর্তমান তরতিব ও গতি-প্রকৃতির ওপর আমি সন্তুষ্ট; উপরন্তু বাংলেওয়ালি মসজিদের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আমার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়ে পড়ে, তখন কয়েক দিন ইসতিখারা করে আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, মেহনতের সাথীদের সামনে আমার নিজস্ব অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার। যখন পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে তখন এ বান্দা পুনরায় উপস্থিত হতে বিন্দু পরিমাণ দেরি করব না। আমি কারো প্রতিপক্ষ হয়ে গুজরাটে ফিরে যাইনি; বরং কাজের হিফাযতের স্বার্থে এবং চাটুকারিতা থেকে বাঁচতেই ফিরে এসেছি। আল্লাহর কাছে আমাকেও জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তাআলা এই মেহনত ও এর সাথীদেরকে নিরাপদ রাখুন। আমীন।

বান্দা ইবরাহিম দেওলা
বর্তমান অবস্থান : দেউলা,
জেলা : ভারুঞ্চ,
প্রদেশ : গুজরাট
১৫ আগস্ট ২০১৬। রোববার

৫৮৯ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   কোন ষড়যন্ত্রেই বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা থামবে না : সমাজকল্যাণমন্ত্রী   ❖   বিএনপির রাজনীতি চলে গেছে জিয়া পরিবারের বাইরে   ❖   নির্বাচন কমিশন কোনো দলের কথায় কাজ করবে না : সিইসি   ❖   সেই গোপালগঞ্জ এই গোপালগঞ্জ   ❖   দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী   ❖   আমিও একজন দালাল!   ❖   জামিন পেল ‘ধর্ষক বাবা’ সেই রাম রহিম   ❖   চীনের আন্ডারগ্রাউন্ড এয়ারবেস তৈরি নিয়ে চিন্তিত ভারত!   ❖   ফরিদপুরে পুড়ে গেছে ২৫ দোকান, ৩ কোটি টাকার ক্ষতি   ❖   সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, ২ শিশু নিখোঁজ