All for Joomla The Word of Web Design
আন্তর্জাতিক

‘আমাদের ভিশনটিকে আমরা আরেকটু স্পষ্ট করতে চাই, ইসলামী সংবিধান মোতাবেক মধ্যপন্থার একটি শক্তিশালী এবং সবার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ দেশ গড়ব।’ – যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান

যুবরাজ মুহাম্মদের বয়ানে সৌদির ভিশন ২০৩০

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

বিশ্বের অন্যতম বিত্তশালী ও সর্বাধিক তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিজস্ব তেলনির্ভরতা কমাতে এবং দেশের অর্থনীতির ক্রমোন্নয়নের লক্ষ্যে গত বছরের এপ্রিল মাসে দেশটির মন্ত্রিসভায় ‘ভিশন-২০৩০’ নামে এক মহাপরিকল্পনার অনুমোদন করেছে। এই অর্থনৈতিক প্রকল্পের মাধ্যমে তেল বিক্রির ওপর দেশটির আর্থিক নির্ভরশীলতা সিংহ ভাগ কমে আসবে বলে আশা করছে পর্যবেক্ষকরা।

সৌদি আরবের রাজস্ব আয়ের ৭০ শতাংশ আসে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে। তবে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় সৌদির অর্থনীতিতে ভাঙন ধরেছে। গত বছর দেশটির তেল রপ্তানি আয় ২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ জন্য তৈরি হওয়া ঘাটতি বাজেট কমাতে বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী এ দেশটি।

সৌদির বৃহৎ অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এবং একটি সার্বভৌম তহবিল গঠনের নিমিত্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল উৎপাদনকারী কম্পানি আরামকোর (Aramco) ৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হবে, যার বাজার মূল্য ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই শেয়ার বিক্রি থেকে যে তহবিল গঠিত হবে তার পরিমাণ দাঁড়াবে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে। আরামকোর এক-শতাংশ শেয়ারও যদি পুঁজিবাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে তা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক দর প্রস্তাব (আইপিও)। এটি পুঁজিবাজারে ফেসবুক বা আলিবাবার শেয়ার বিক্রির রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আল-আরাবিয়্যার একটি সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫০ হাজার কোটি ডলার বা প্রায় ৪০ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সাড়ে ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত একটি মহানগর তৈরির পরিকল্পনা করছে সৌদি সরকার, যা মিসর ও জর্দান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর জন্য হাতে নেওয়া হয়েছে মহানগর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির এ পরিকল্পনা।গত আগস্টে ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনাধীন একটি পর্যটন প্রকল্পের যাত্রা শুরু করেছে সৌদি আরব। এর আওতায় রয়েছে ১০০ মাইল দীর্ঘ বালুকাময় উপকূল ও ৫০টি দ্বীপের একটি উপহ্রদ।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের এ সময় সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকেই ধাবিত করছে। এ সম্ভাবনাকে পূর্ণতায় রূপ দিতে দেশটির পবিত্র শহর মক্কায় বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা হবে, যা ভিশন ২০৩০-এর জন্য অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে দেশটিকে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত করার জন্য এবং দেশটিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পুরো পৃথিবীর মৌলিক প্রবেশদ্বারে রূপান্তরিত করতে সৌদি আরব যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে, তার মূলে প্রতিবছর হজ পালন করার বিষয়টি কাজ করছে। এটা খুবই বাস্তবসম্মত ও সময়ের সঙ্গে মানানসই দৃষ্টিভঙ্গি। ভিশন ২০৩০-কে কেন্দ্র করে মক্কাকে ফের সুবিন্যস্ত করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টা চলছে। সৌদি আরবের যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা অন্য দেশগুলোর নেই অথবা কখনো সম্ভবও হবে না। মক্কাকে ২০০ কোটি মানুষের পবিত্র শহরে রূপান্তরিত করতে পারলে তা মুসলমানদের অর্থনৈতিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে নতুন আন্দোলন হিসেবেই গণ্য হবে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চ্যানেল ‘আল আরাবিয়্যা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি এবং সম্পূর্ণ জ্ঞাত যে আল্লাহ তাআলা আমাদের অত্যন্ত মোবারক ও পবিত্র একটি ভূমি দান করেছেন, যা পেট্রোলিয়ামের চেয়ে অত্যধিক মূল্যবান। আমাদের দেশে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান হারাইমাইন শরিফাইন। আমাদের দেশে বিশ্বের এক বিলিয়ন মুসলমানের কাবা রয়েছে। এটিই আমাদের আরব ও ইসলামী তাৎপর্য এবং সাফল্যের প্রথম কারণ।

অনুরূপভাবে আমাদের দেশে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন বা গতিপথ চালু করতে এবং আমাদের দেশের জন্য অতিরিক্ত সম্পদের উৎস সৃষ্টি করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আর এটি আমাদের দ্বিতীয় সাফল্য ফ্যাক্টর।

আমাদের দেশের একটি কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে। সৌদি আরব পৃথিবীর তিনটি মহাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারের অবস্থানে রয়েছে এবং আমাদের দেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বেষ্টিত হয়ে আছে। আর এটি আমাদের সাফল্যের তৃতীয় কারণ।

এই তিনটি বিষয় হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি, যার দিক-দিগন্তের প্রতি আমরা দৃষ্টি দিতে শুরু করেছি। আমরা একসঙ্গে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির বিকল্পগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন শক্তি বাড়াতে চাই। যার মধ্যে বিপুল স্বর্ণ, ফসফেট, ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য যথেষ্ট সম্পদ-বৈভব রয়েছে। আমরা সৌদি আরবের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নই। কিন্তু আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমে অত্যুজ্জ্বল একটি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি, প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ ও আল্লাহপ্রদত্ত অর্জিত বিভিন্ন সম্পদ ও তাঁর সাহায্যের মাধ্যমে একটি আলোকময় ভবিষ্যৎ তৈরি করতে যাচ্ছি। অতীতে কী হারিয়েছি বা আজ ও কাল কী হারাব, তা আমরা ভাবছি না; বরং সর্বদা ভবিষ্যতের পানে এগিয়ে চলছি।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের দক্ষতা দ্বিগুণ করতে চাই এবং রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি আরামকোকে শুধু তেল উৎপাদনকারী কম্পানি থেকে রূপান্তর করে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত সুবিশাল শিল্প অপারেটিং প্রকল্পে পরিণত করতে চাই।

আমাদের এসব কর্মপরিকল্পনা শুধু দেশের আর্থিক আয়ের ঘাটতি পূরণ বা আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার জন্য নয়; বরং আরো উন্নততর সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে। সব নাগরিক মিলেমিশে আমরা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব। দেশকে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পরিষেবা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, হাউজিং, বিনোদন ও আরো অনেক কিছু অগ্রগণ্য। দেশের নাগরিকদের সেবা করার ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য আদর্শ হতে চাই। পাশাপাশি আমরা আমাদের দেশের নাগরিকদের কার্যদক্ষতার সহায়তা নিয়ে সমৃদ্ধ, শক্তিশালী, কল্যাণমুখর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কাঙ্ক্ষিত স্বদেশ নির্মাণ সম্পন্ন করব। আমরা বৈদেশিক বাজারের পণ্যের মূল্য বা গতিশীলতার ওপর নির্ভর না করে আমাদের সন্তানদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তা থেকে উপকার লাভ করতে পারি। সবাই মিলেমিশে কাজ করে লক্ষ্য অর্জনের প্রতিটি উপাদান আমাদের কাছে রয়েছে। আল্লাহর ফায়সালা যদি ভিন্ন হয়, তাহলে অন্য কথা। না হয় আমাদের পশ্চাৎপদ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদের ভিশনটিকে আমরা আরেকটু স্পষ্ট করতে চাই, ইসলামী সংবিধান মোতাবেক মধ্যপন্থার একটি শক্তিশালী এবং সবার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ দেশ গড়ব।

আমাদের ভিশনের স্তম্ভ তিনটি। এক. আরব ও ইসলামী গভীরতা। দুই. বিনিয়োগ শক্তি। তিন. কৌশলগত ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। আমাদের দেশ বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিশালী, সমৃদ্ধময় ও উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্যে, স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এবং দেশের ক্রমোন্নতি ও সুখসমৃদ্ধি সৃষ্টির তরে আমরা বেশ কয়েকটি দিগন্ত উন্মোচন করব। এই প্রতিশ্রুতি সবার সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে।

আমরা এই বৃহৎ প্রকল্পের নাম দিয়েছি ‘সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০’। আমরা অপেক্ষা না করে এখন থেকেই কাজ শুরু করব। আল্লাহ তাআলা চাইলে সৌদি আরব অচিরেই বিশ্বের দরবারে বৃহৎ ও শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ’ (http://vision2030.gov.sa/ar/node)

সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ

১,৮১৯ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   কোন ষড়যন্ত্রেই বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা থামবে না : সমাজকল্যাণমন্ত্রী   ❖   বিএনপির রাজনীতি চলে গেছে জিয়া পরিবারের বাইরে   ❖   নির্বাচন কমিশন কোনো দলের কথায় কাজ করবে না : সিইসি   ❖   সেই গোপালগঞ্জ এই গোপালগঞ্জ   ❖   দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী   ❖   আমিও একজন দালাল!   ❖   জামিন পেল ‘ধর্ষক বাবা’ সেই রাম রহিম   ❖   চীনের আন্ডারগ্রাউন্ড এয়ারবেস তৈরি নিয়ে চিন্তিত ভারত!   ❖   ফরিদপুরে পুড়ে গেছে ২৫ দোকান, ৩ কোটি টাকার ক্ষতি   ❖   সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, ২ শিশু নিখোঁজ