All for Joomla The Word of Web Design
ইউরোপ

উন্নত ভাবনায়, উন্নত দেশ ফ্রান্স-৩

 খান মুফতি মাহমুদ
ফ্রান্স প্রবাসী লেখক, বিশেষ প্রতিনিধি

প্রবাসে থাকি বিধায় প্রবাসের যে দেশে আমার বসবাস তার পরিচয়, সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার কিছু চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস আমার এ লেখায়। ইচ্ছাটা ছিল, ফ্রান্স প্রবাসীদের নিয়ে লেখার। তবে শুরু করতে যেয়ে মনে হলো, যাদের নিয়ে লিখব, তারা কোথায় থাকেন, সে অবস্থান সম্পর্কে তো আগে জানা দরকার। তাই প্রাসঙ্গিক কারণেই উঠে এসেছে লেখার অনেকাংশ জুড়ে ফ্রান্সের সামাজিক অবস্থানের বাস্তব চিত্রের বিভিন্ন দিক খুবই সংক্ষিপ্তভাবে।

পৃথিবীর বুকে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তির কথা বারংবার বলা বাহুল্যতা। তবুও যৌক্তিক কারণে লিখতে হচ্ছে। প্রায় সাত কোটি জনসংখ্যার এ দেশে এক কোটির অধিক অভিবাসী বাস করেন। যার মধ্যে আনুমানিক ১৫ হাজার আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশিও রয়েছি। সঠিক পরিসংখ্যান জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ভাগ বাংলাদেশি বৈধভাবে এদেশে বাস করছেন। বাকিরা এদেশের নিয়ম অনুযায়ী আইনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে। যদিও আমরা সরাসরি বলে থাকি রাজনৈতিক আশ্রয়; তবে সত্যিকারভাবে তা হলো ফ্রান্সে অবৈধ বা বৈধভাবে প্রবেশ করে, এদেশের ‘রেসিডেন্ট’ ও ‘ওয়ার্ক পারমিট’ পাবার একটি প্রক্রিয়া।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ফ্রান্সের জনসংখ্যার প্রায় ৮৯% জন্মগত ফরাসি নাগরিক। বাকিরা আফ্রিকা, এশিয়া, মাগরেবি, আমেরিকান ছাড়াও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আগত। একটি মজার ব্যাপার হলো, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও তার আশপাশের এলাকা ঘুরলে দেখা যাবে, বহু কালো মানুষের চলাচল। যাদের আমরা সাধারণত ‘আফ্রিকান নিগ্রো’ বলে থাকি বা চিনি। ফ্রান্সের সাদার মাঝে এতো কালো দেখলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে– ফরাসিরা কি কালোও নাকি! বাস্তবতা হলো, আফ্রিকান অভিবাসীরা যুগের পর যুগ ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে ফ্রান্স ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের সাথে। ফ্রান্স যাদেরকে শাসন করতো বা এখনও করে থাকে। যে দেশগুলোকে ফ্রান্সের ‘কলোনি’ বলা হয়।

এখন চলে যেতে চাই আমাদের কথায় অর্থাৎ বাংলাদেশিদের কথায়। সকল বাংলাদেশিদের নিয়ে লেখার সাহস ও সক্ষমতা আমার নেই, জানি; তবুও কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা আর-কি। যুগের ও বেশী সময় ধরে বৈধতা ও ফ্রান্সের জাতীয়তা নিয়ে বসবাস করায় বাংলাদেশের বন্ধুমহল সহ অনেকেই জানতে চান এ দেশ সম্পর্কে, এ দেশের মানুষ ও এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতির কথা। তাছাড়া এদেশে আমাদের বৈধতার প্রক্রিয় কী? আমরা কী কাজ করি ? আমরা কী খাই? আমরা কীভাবে থাকি? আমাদের পরিবার-পরিজন ও এখানকার পরিবার-পরিজনের সম্পর্ক, পার্থক্য। এ লেখার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের সবটাই যেহেতু ফরাসিদের নিয়ে লেখা অর্থাৎ ধারণা দেওয়া, তাই আর সেদিকে যাচ্ছি না।

বৈধতার প্রক্রিয়া: ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে ইচ্ছুক যে কাউকেই এ দেশের আইনের বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তিনি যে পন্থায়ই ফ্রান্সে প্রবেশ করে থাকুন না কেন, বিষেশ করে বাংলাদেশিদের জন্য উল্লেখযোগ্য যে আইনগুলো চালু রয়েছে তার মধ্যে:

১. অভিবাসী আইনে রাজনৈতিক আশ্রয় বা ‘এস্যাইলাম’।

২. বিবাহ আইনে অর্থাৎ বৈধ কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে।

৩. অসুস্থতা আছে, কিন্তু যার চিকিৎসা দীর্ঘ মেয়াদী এবং বাংলাদেশে নেই।

৪. দশ বছর অবস্থানের পরও যিনি বৈধ হতে পারেনি।

৫. নিয়মিত যিনি কাজ করেন– তার বৈধ ডিক্লারেশনের আছে।

৬. স্টুডেন্ট ভিসায় আগত, পড়াশোনা করছেন– তিনি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলেও পারমানেন্ট রেসিডেন্ট এর জন্য আবেদন করতে পারেন।

বাসস্থান: কথিত আছে, সমগ্র ইউরোপের মধ্যে ফ্রান্সে বসবাসের জন্য বাসা পাওয়া খুবই জটিল এবং ব্যয়বহুল। যার প্রধান কারণ–

১. অতিরিক্ত অভিবাসী।

২. কাজের বেতনের সাথে বাসা ভাড়ার আইনি অর্থাৎ গানিতিক অসামঞ্জস্যতা। যেমন, বেতন হতে হবে বাসা ভাড়ার তিন গুণ। (৭০০ ইউরো> বেতন ২১০০ ইউরো)। অপরদিকে খোদ ফরাসিরা কিন্তু আমাদের মতো সমস্যার সন্মুখীন হন না। তারমানে আমরা অর্থাৎ প্রবাসীরা রাস্তায় থাকি না। সকল জটিলতা পেরিয়ে সন্মানের সাথে বসবাসের চেষ্টা করি। বেসরকারী বাসা ভাড়া ছাড়াও অনেকেই সরকারী বাসার বরাদ্দ পেয়ে থাকেন। সুখের কথা হলো, প্রতিনিয়ত প্রবাসী বাংলাদেশিরা এপার্টমেন্ট ও বাড়ি কিনে বসবাস করছেন।

কর্মসংস্থান: সারাবিশ্ব ব্যাপী যেমন বাংলাদেশিদের শ্রম, মেধা, সততার কদর ও সন্মান রয়েছে, ঠিক তেমনি ফ্রান্সেও বাংলাদেশিরা নিষ্ঠার সাথে তাদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। একদিকে যেমন এদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, অপরদিকে রেস্টুরেন্ট, হালাল ফুড, সাইবার ক্যাফে, মানি এক্সচেঞ্জ, বিভিন্ন বুটিক-এর ব্যবসা ইতোমধ্যেই শুরু করেছেন।

যে বিষয়টি সকলের জানা প্রয়োজন তা হলো, ফ্রান্সে বৈধ কাগজপত্র ব্যতীত কাজ দেওয়া অর্থাৎ কাজ করানো অবৈধ। তাই এদেশে বসবাসকারী বহু বাংলাদেশিদের কাজের অনুমতি না থাকায় কাজ পাওয়া খুবই কঠিন।

খাবার দাবার: আমি প্রথম যখন এদেশে আসি, মা টেলিফোনে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘আমরা এখানে কী খাই?!’ মায়ের প্রশ্নের অর্থ ছিল, ‘এদেশে বাংলাদেশি খাবার খেতে পারি কি-না?’ তখন মাকে খুশি করার জন্য বলেছিলাম, “মা পয়সা হলে সবই পাওয়া যায়।’ কিন্তু প্রায় ‘দেড় যুগ’ পরে অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সত্যি সত্যি এখন আমাদের খাবার অর্থাৎ সাকসবজি (সিম, পটল, কচুর লতি), জলপাই, আমলকি, বড়ই, মাছ কিংবা শুটকি দেশি মিষ্টি, পান-সুপারি সবই বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানে বিক্রি হচ্ছে।

একটি বিষয় না বললেই নয়, বাংলাদেশি খাদ্যে ভেজালের কথা জেনেও ভেজালমুক্ত খাবারের দেশে এই প্রবাসে বসে প্রায় দ্বিগুণ মূল্য দিয়ে দেশী পণ্য ক্রয় করতে আমরা কখনই দ্বিধাবোধ করি না।

অনেকেই জানতে চান, দেশীয় জিনিসপত্রের দাম ফ্রান্সে কী রকম?–তাদের জ্ঞাতর্থে–

বাংলাদেশী সবজি ৩. ৯০ ইউরো প্রতি কিলো, টাকায় প্রায় ৩৮০।

ইলিশ মাছ ২৫ ইউরো কিলো, ওজন দুই কিলো হলে।

তবে ঝাটকা ইলিশ ১০/১৫ ইউরো প্রতি কিলো।

আইল মাছ ১২/১৫ ইউরো প্রতি কিলো।

জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব: জাতীয়তা বা নাগরিকত্ব বলতে একটি রাষ্ট্র বা ব্যক্তির মধ্যে আইনি সম্পর্ক বুঝায়। রাষ্ট্র দ্বারা ব্যক্তির সুরক্ষা হওয়া এবং ভোটাধিকার প্রয়োগসহ ব্যক্তির কতগুলো অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। এদেশে যেকোনো প্রক্রিয়ায় বৈধতা পাওয়া মানেই নাগরিকত্ব পাওয়া নয়।

আনন্দের সংবাদ হলো, আমরা বাংলাদেশীরাও দিনে দিনে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব নিচ্ছি। বিষয়টি যদিও খুব সহজ নয়; তবুও আমরা কঠিনকে জয় করছি। একমাত্র বৈধকাগজ বা রেসিডেন্ট পারমিটধারীরাই সরকার ঘোষিত নির্দিষ্ট সময় ফ্রান্সে অবস্থান, প্রয়োজনীয় ভাষা জানা ও বৈধ কাজের প্রমাণসহ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ দ্বারা যাচাই বাছাই ও ইন্টারভিউ শেষে নাগরিকত্ব পেতে পারেন। তবে এমনটা ভাবার কারণ নেই যে, সবাই পাবেন।

আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম: সঠিক সময় জানা না গেলেও কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশীরা ফ্রান্সে মাইগ্রেশন শুরু করেছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। এদেশেও জন্মগ্রহণ করছে নতুন প্রজন্ম। শিক্ষা-দীক্ষায় নতুন প্রজন্মের পদার্পণ আমাদের বাংলাদেশী কমিউনিটিকে আশার আলো দেখাচ্ছে। পিতা-মাতারা সন্তানদের আলোকিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন। ফ্রান্সের নামকরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াবার চেষ্টা করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছেন। হয়তো সেইদিন খুব দূরে নয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আলোর দ্যুতি ছড়াবে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে, আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে ফরাসিদের মাঝে ও বিশ্ব দরবারে।

এক নজরে ফ্রান্সে বাংলাদেশীদের সমস্যাসমূহ:

ভাষাগত বিড়ম্বনা। বৈধতা প্রাপ্তিতে ভোগান্তি। কাজের সমস্যা। নতুন আগতদের সঠিক গাইডলাইনের অভাব। বাংলাদেশ ও ফ্রান্স সরকারের সাথে আমাদের বৈধতা ও কাজের বিষয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা চুক্তি না থাকা।

তবে! যে কথাগুলো না বললেই নয়, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ফ্রান্স প্রবাসীদের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন ঘটছে যা চোখে পড়ার মতো। যেমন, ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছেন অনেকে নতুনদের জন্য। আবার সাংগঠনিকভাবে উপকৃত করার চেষ্টা হচ্ছে বাংলাদেশীদের জন্য।

যাদের মধ্যে অন্তত একটি অরাজনৈতিক স্বার্থহীন সংগঠন, যা আমার কাছে খুবই ভালো মনে হয়েছে তার নাম উল্লেখ করতে চাই, “Bangladesh community in France (BCF)”
যাদের মাধ্যমে যে কেউ হারিয়ে যাওয়া পথ খুঁজে পেতে পারেন সঠিক পরামর্শ প্রাপ্তির মাধ্যমে।

আনন্দের কথা হলো, ফ্রান্সে দিন দিন বৈধভাবে বসবাসের সংখ্যা বাড়ছে এবং বৈধরাই চাকুরি, ব্যবসার মাধ্যমে সাবলম্বী হয়ে নিজে এবং পরিবারকে সুখের সাগরে ভাসাচ্ছেন। পাশাপাশি মাতৃভূমি বাংলাদেশকে রেমিটেন্স দিয়ে সমৃদ্ধ করছেন।

এছাড়া অনেকগুলো সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, যারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ কমিউনিটির মাঝে তুলে ধরছেন দেশীয় কালচার বা সংস্কৃতি।

তবে কিছু ব্যতিক্রমী দুঃখজনক ঘটনাও রয়েছে, যা আমার এ লেখায় উল্লেখ করতে চাই না।

প্রবাসে নতুনদের জন্য আমার চিন্তা: “মেঘ দেখে তুই করিস না ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।”

বাংলাদেশের পপ সম্রাট, প্রয়াত সংগীত শিল্পী আজম খানের গাওয়া প্রবাসীদের নিয়ে একটি গান ছিল এরকম,

“বাংলাদেশের বাঙ্গালি
বৈদেশ আইসা কাঙ্গালি
মনেতে দুঃখের সীমা নাই।”

প্রবাসে বসে আমরা অনেকেই এ ধরনের দুঃখভরা গান শুনে হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাই, অথবা কেউ কেউ প্রবাসে তাদের নানাবিধ কষ্টের কাহিনি বাংলাদেশে পরিবার-পরিজনদের জানাতে পারলে সুখ অনুভব করেন।

কিন্তু আমার ভাবনাগুলো এরকম:

“কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে”

—কৃস্নচন্দ্র মজুমদার

“সংসার সাগরে দুঃখ তরঙ্গের খেলা আশা তার একমাত্র ভেলা”

অথবা কবি গুরুর ভাষায়,

“মেঘ দেখে তুই করিস না ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।”

সকল দুঃখ-কষ্ট, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার রেমিটেন্স পাঠানো প্রবাসীরাই (রেমিটেন্স যোদ্ধারা) বেঁচে থাকুক মাথা উঁচু করে বিশ্বব্যাপী।

লেখকের ই -মেইল:
muftymk@yahoo.fr
অথবা
khanmuftymahmud@gmail.com

মাই নিউজ/মাহদী

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   ধর্মান্তর নিষিদ্ধ হচ্ছে ভারতে! নিষিদ্ধ ‘লাভ জেহাদ’   ❖   পানিবাহিত রোগ ও তার প্রতিরোধ   ❖   কুরবানি তাকওয়ার শিক্ষা   ❖   সামাজিক যোগাযোগ কি আমাদের অসামজিক ও অবাধ্য করে তুলছে!   ❖   কোরবানী: তাকওয়া অর্জনের অন্নতম একটি মাধ্যম   ❖   জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই   ❖   র‍্যাগ ডে: বিজাতীয় সংস্কৃতির নতুন উম্মাদনা   ❖   বাংলাদেশ ইসলাম ও আলেম-ওলামার দেশ   ❖   সেইজ দ্যা ডে সংস্কৃতি ও আমরা…   ❖   দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য