All for Joomla The Word of Web Design
নির্বাচিত পোস্ট

শেখার আছে কত কিছু

মুহাম্মাদ শিহাব উদ্দিন

নতুন ছাত্রদের জন্য কিং সাউদ ইউনিভার্সিটির প্রোগ্রামসমূহের একটি হলো “বিনাউয যাত”। “বিনাউয যাত” অর্থ নিজেকে গঠন বা নিজেকে প্রস্তুত করা। এই প্রোগ্রামের প্রধান আমাদের এক বাংলাদেশী ছাত্র। রাহমাতুল্লাহ ভাই। ইউনিভাসির্টিতে বাংলাদেশী ছাত্রদের আলাদা একটা মর্যাদা এবং সম্মান আছে। উস্তাদরা তাদের খুব প্রশংসা করেন। আন্নাদী আছ-ছাকাফীর প্রধান বাংলাদেশী আফলাতুন ভাই। কিছুদিন আগে “জানাদরিয়্যাহ” গিয়েছিলাম।ঐ সফরের মুশরিফ ছিলেন আফলাতুন ভাই। বাংলাদেশীদের মধ্যে নাকি নেতৃত্বের গুণ আছে। তারা সবাইকে নিয়ে একসাথে চলতে পারে। শায়খ ড. আব্দুল্লাহ বিন দুজাইন আস-সাহলীর বুখারী শরীফের দারসে ইবারত পড়েন মিযান হারুন ভাই। আমার খুব ভাল লাগে। বাংলাদেশকে নিয়ে তখন খুব গর্ব হয়।

“বিনাউয যাত” এর আজকের আয়োজন ড. ইউসুফ বিন উমর এর দাওরায় অংশগ্রহণ। প্রিন্স ফাইসাল বিন ফাহাদ সেমিনার হলে এ দাওরা অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সবাই হল গেইটে উপস্থিত। ইউনিভার্সিটির গাড়ি আমাদের নিয়ে যাবে। মসজিদের সামনে দেখা হল নতুন এক ছাত্র ভাইয়ের সাথে। কোন দেশের জিজ্ঞিস করতেই বল্ল, নাইজেরিয়ার পাশে ছোট্ট একটি দেশ “বুরকিনা ফাঁসেও”। আমি খুব অবাক হলাম। এই দেশের নাম আমি আজ জীবনের প্রথম শুনলাম। বিশ্বের মানচিত্রে এই দেশটি কখনো আমার চোখে পড়েনি। বুরকিনা ফাঁসেও শব্দের অর্থ ভাল মানুষদের ভূমি। ঐ ছাত্রটিও বাস্তবে অনেক ভাল এবং ইলম পিপাসু ছিল। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, নানা রঙের মানুষকে এখানে উপস্থিত করেছেন। ইলম অর্জনের জন্য। কল্পনাও করিনি, একসাথে এতগুলো দেশের মানুুষের সাথে কখনো পরিচয় হব।

আসরের সালাতের পর আমরা সবাই হলে উপস্থিত হয়েছি। আজকের বিষয় “আত- তাআ‘ল্লুম আয-যাতি”। নিজে নিজে শিখা। কীভাবে নিজ থেকে জ্ঞান অর্জন করব, সে ব্যাপারে দারস। উস্তাযের হাসিমাখা মুখ এবং উজ্জ্বল চেহেরা দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম আজকের দারস অনেক জমজমাট এবং প্রাণবন্ত হবে। আমাদের ধারণা সঠিক ছিল। পুরো সময়টাই আমরা উপভোগ করেছি। মঞ্চে ওঠে উস্তাদ প্রথমে সালাম দিলেন। এরপর বল্লেন, আমি জানতে চাই আপনাদের মধ্যে কোন কোন মাযহাবের ছাত্র আছে। প্রথমে আল-ইমাম আবু হানিফা নুমান বিন ছাবিত (রহঃ) এর নাম নিতেই আমরা চার বাংলাদেশী হাত তুললাম। ইমাম মালিক বিন আনাস (রহঃ) এর মাযহাবের ছিল অধিকাংশ আফ্রিকানরা। ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, ফিলিপাইন এর ছাত্ররা ছিল মুহাম্মাদ বিন ঈদরীস আশ-শাফেয়ী (রহঃ) এর মাযহাবের অনুসারী। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) এর মাযহাবের কোন অনুসারী সেখানে ছিল না উস্তাদ ব্যতীত। শায়খ বল্লেন, এই চার ইমাম হলেন কুরআন এবং সুন্ন্াহর চারটি ফুল। যে ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে। পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম, এবং মুসলিমরাই একমাত্র জাতি, যাদের রয়েছে ধারাবাহিক এক সনদ। যাদের সনদ পৌঁছে যায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সঃ) পর্যন্ত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) নিয়েছেন জিব্রীল (আঃ) থেকে। জিব্রীল (আঃ) সরাসরি আল্লাহ থেকে। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি আছে যারা ধারাবাহিকভাবে নিজেদের ইলমের সনদ সংরক্ষণ করেছে? “রিজাল” বিষয়ে ইলমের স্বতন্ত্র শাখা হওয়া একমাত্র মুসলিম উম্মাহর বৈশিষ্ট্য। ওহীর জ্ঞান অর্জনে এ জাতি যে কুরবানী দিয়েছে, ইতিহাসের পাতায় সেই কুরবানীর অন্য কোন দৃষ্টান্ত নেই। ইলম অর্জনের জন্য পায়ে হেটে, উটে চড়ে পুরো দুনিয়া সফর করেছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল বুখারী (রহঃ)। একেকটি হাদিস অর্জনের জন্যে সাহাবারা (রাঃ) মাসের পর মাস সফর করেছেন। শায়খের দরজায় পড়ে থেকেছেন।
জ্ঞান অর্জন দুইভাবে হয়। ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে। ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই মূলত আত-তাআ‘ল্লুম আয-যাতির সূচনা। হেদায়ার হাদীসগুলো তাখরীজ করতে হবে, আমি এখন কী পড়তে পারি? আমাকে পড়তে হবে ইমাম যায়লাঈর নাসবুর রায়া, ইবনে হাজার আসকালানীর আদ-দিরায়াহ। ইমরুল ক্বায়সের মুআল্লাকার অর্থ বুঝতে হলে আমাকে শারহুয যাওযানি বা শারহুত তিবরিযি পড়তে হবে। আমি যদি তাফসীর সম্পর্কে জানতে চায়, বা আহকামুল কুরআন সম্পর্কে জানতে চায় তাহলে আমাকে এ সম্পর্কীয় কিতাবগুলো পড়তে হবে। সব ইলম নিজে নিজে অর্জন করা যায় না। যেমন “ইলমুল ফারাইয”, ব্যক্তিগতভাবে এই ইলম শিক্ষা করা অসম্ভব। ইলমের জন্য উস্তাদ প্রয়োজন।
পড়া তিন ধরণের হয়। ক্বিরাআতুল ভিরদ (قراءة الورد ), ক্বিরাআতুছ ছালাছ (قراءة الثلاث), আল ক্বিরাআতু বিছ ছাওতিল আলি ((القراءة بالصوت العالي। ক্বিরাআতুল ভিরদ হল, মৌলিক কিতাবগুলোর মূল টেক্সট বা মুতুনকে বারবার পড়া। মৌরিতানিয়ার ছাত্ররা মৌলিক কিতাবগুলোকে কুরআনের ন্যায় পড়তে থাকে। প্রতি সপ্তাহে একবার মুতুনের খতম করে। যার কারণে তাদের অন্তরে মাসআলাগুলো একেবারে গেঁথে যায়। ইমাম মুযানী (রহঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি ইমাম শাফেয়ীর “রিসালাহ” কিতাবটি পাঁচশ বার পড়েছেন! ভাবতেই অবাক লাগে! আমাদের মধ্যে এমন হিম্মতওয়ালা কে আছে? কমপক্ষে একটি মৌলিক কিতাবের মুতুন বারবার পড়া উচিৎ। যেমন, বুলুগুল মারাম, কুদুরীু, শরহে আজুররুমি, রিসালাহ, কিতাবুত তাওহীদ ইত্যাদি। “ক্বিরাআতুছ ছালাছ” হল বিশ্লেষণধর্মী আলোচনাগুলো কমপক্ষে তিনবার পড়া। এর কম না পড়া। এতে আলোচনাগুলো পুরোপুরি না হলেও অনেকটা আত্মস্থ হবে। তৃতীয় “আল ক্বিরাআতু বিছ ছাওতিল আলি”। অনেক পড়া আছে যেগুলো উচ্চ স্বরে পড়তে হয়। যেমন কবিতা। কবিতা উচ্চ স্বরে না পড়লে কবিতার স্বাদ পাওয়া যায় না। অনেকের জীবনীতে পাওয়া যায় তারা জাহেয এর “আল বয়ানু ওয়াত তাবয়ীন” উচ্চ স্বরে পড়তেন। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে বলতেন, নিজেকে শুনানোর জন্যেই উঁচু আওয়াজে পড়ছি।

পড়ার সাথে সাথে হিফযের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে পাঁচটি বিষয় মুখস্থ করার প্রতি খুব খেয়াল রাখতে হবে। কুরআন, হাদীস, মুতুন, কবিতা, এবং সংঙ্গা। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার মুখস্থ করা টেক্সটগুলোকে মুরাজাআহ করতে হবে। এতে হিফয কমে যাওয়া বা একেবারে হারিয়ে যাওয়ার আশংকা কমবে। আমরা অনেকেই উসুলুল ফিক্বহ এর প্রসিদ্ধ কিতাব “আল-মু‘তামাদ” এর নাম শুনেছি।বিশাল দুই খন্ডের। মুহাম্মাদ বিন আলী বিন তায়্যিব এর লেখা। ইমাম ফাখরুর রাযী কিতাবটি মুখস্থ করেছিলেন। আবু বাকার আবু যায়দকে তার ছাত্র জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি এত সুন্দর করে কথা বলা কোথা থেকে শিখেছেন? তিনি বলেছিলেন, আমি আবুল কাসিম হারীরীর সম্পূর্ণ মাকামা মুূখস্থ করেছি। আবু বাকার আবু যায়দের লেখা ছিল দ্বিতীয় শতকের আলেমদের মত। অনেকটা কঠিন। মুহাম্মদ বিন ছালিহ আল উছাইমিন তার কিতাবের শরাহ লিখেছেন, অথচ তিনি বয়সে আবু বাকারের ছোট। সংঙ্গার ক্ষেত্রে মানতিকীদের অভিমত হল, সংঙ্গাকে “জামে” এবং “মানে” হতে হবে। এটা সংঙ্গাকে অনেক জটিল করে ফেলে। ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর দৃষ্টিতে সংঙ্গা যদি কোন বিষয়কে স্পষ্ট করে এবং অপর বিষয় থেকে পৃথক করে, এতটুকুই যথেষ্ট। ইমাম সিবওয়াই তার প্রসিদ্ধ “আল-কিতাব” এ শুধু উদাহরণ দিয়েই অনেক পরিভাষার সংঙ্গা দিয়েছেন।

হিফয এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য। ছোট ছোট অনারব শিশুরা কুরআনের ভাষা না জেনেই কুরআন মুখস্থ করে। এটা আল্লাহর নিয়ামত। আমাদের পূর্বপুরুষরা শত শত, হাজার হাজার, এমনকি লক্ষ হাদীসও মুখস্থ করেছিলেন। হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহঃ) এর ইন্তেকালের পর তার কাপড়ের পকেটে কিছু কাগজ পাওয়া গিয়েছিল। ঐ কাগজগুলোতে হাদীসের অংশ লিখা ছিল। হাদীসের অংশ বিশেষ লিখেছিলেন যাতে এই খন্ড অংশ দেখে পুরো হাদীসটাই মনে পড়ে যায়।
আমরা তাদের নিয়ে গর্ব করি। তারাই আমাদের জন্য ইসলামকে হিফাযত করেছেন।
আমি যা পড়ব তা যেন আমার অন্তরে গেঁথে যায়, এবং যা পড়ছি তা যেন আমি ভালভাবে বুঝতে পারি…তাই আমাকে কয়েকটি কাজ করতে হবে।
১-প্রতিটি প্যারা পড়ার পর, আমাকে ঐ প্যারা থেকে প্রশ্ন তৈরী করতে হবে। প্রশ্নগুলো খাতায় নোট করতে হবে। উত্তরগুলোও মার্ক করে রাখতে হবে।
২-আমি যা পড়েছি তার সারমর্ম লেখা। দশ লাইন পড়লে তা দুই লাইনে ব্যক্ত করা।
৩-যা পড়েছি তার ব্যাখ্যা লেখা। আমরা ইমাম নাববীর নাম শুনেছি। রিয়াদুস সালিহীন এর সংকলক। তার ব্যাপারে ইসনাবী বলেন, শায়খ মুহিউদ্দীন যখন কাজের জন্যে দামেশক আসেন তখন বয়স ছিল আঠারো। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছেচল্লিশ পূর্ণ হয়নি। অথচ তিনি অনেক কিতাব লিখেছেন। তার কারণ, যখনি তিনি কোন কিতাব পড়তেন বা কিছু শিখতেন, তিনি তা লিখে ফেলতেন। নিজের জন্যে ব্যাখ্যা করে লিখতেন, যাতে পরে উপকৃত হতে পারেন। যেগুলো পরবর্তীতে একেকটি কিতাব হয়ে গিয়েছিল। তিনি তো উপকৃত হয়েছেন, কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ ঐ কিতাবগুলো থেকে উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ। তিনি যে পরিমাণ কিতাব রেখে গেছেন, সেগুলো তার জীবনের প্রত্যেকটা দিনে ভাগ করে দেওয়া হলে গড় পরিমাণ দাড়ায়, তিনি দৈনিক দুটি খাতা লিখে শেষ করেছেন।
৪-আমি যা পড়েছি তা যদি অবিন্যাস্ত হয় তাহলে তা বিন্যাস্ত করা। যেমন, প্রাচীন কিতাবগুলো।
৫-বিস্তারিত আলোচনা হলে তার মুতুন তৈরী করা।
৬-গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং ফায়েদাগুলো একত্রিত করা।
৭-ই‘রাব দেওয়া।
৮- যে বিষয়ে জানতে চাই সে বিষয়ে প্রবন্ধ বা বাহছ লিখা।

কুরআন কারীমের প্রথম আয়াত “ইক্বরা”। আপনি পড়–ন। আমরা জানি “ক্বারাআ” ফে‘ল মুতাআদ্দী। যার মাফউল বিহী প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহ তা‘লা মাফউল বিহী উল্লেখ করেননি। শুধু বলেছেন, তুমি পড়। কী পড়ব? সব পড়ব। যা আমার দুনিয়া আখিরাতকে সুন্দর করবে।আল্লাহ তা‘লাকে সন্তুষ্টি করার নিয়্যাতে পড়ব।
আল্লাহ তা‘লা আমাদেরকে পড়া এবং বুঝার তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক, সৌদিআরবের রাজধানী রিয়াদস্থ কিং সাউদ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও জামেয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া চট্টগ্রামের গ্রাজুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী-স্বর্ণপদক বিজয়ী কৃতিছাত্র।

১৫৬ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   কোন ষড়যন্ত্রেই বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা থামবে না : সমাজকল্যাণমন্ত্রী   ❖   বিএনপির রাজনীতি চলে গেছে জিয়া পরিবারের বাইরে   ❖   নির্বাচন কমিশন কোনো দলের কথায় কাজ করবে না : সিইসি   ❖   সেই গোপালগঞ্জ এই গোপালগঞ্জ   ❖   দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী   ❖   আমিও একজন দালাল!   ❖   জামিন পেল ‘ধর্ষক বাবা’ সেই রাম রহিম   ❖   চীনের আন্ডারগ্রাউন্ড এয়ারবেস তৈরি নিয়ে চিন্তিত ভারত!   ❖   ফরিদপুরে পুড়ে গেছে ২৫ দোকান, ৩ কোটি টাকার ক্ষতি   ❖   সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলার ডুবি, ২ শিশু নিখোঁজ