All for Joomla The Word of Web Design
স্বাস্থ্য পরামর্শ

পানিবাহিত রোগ ও তার প্রতিরোধ

সাদিয়া আফরিন অনু
সুইডেন প্রতিনিধি, মাই নিউজ।

মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর বিভিন্ন রোগের জন্য প্রধানত দায়ী রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস) এবং কয়েক রকমের পরজীবী। এ সমস্ত সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবেরা নানা রকমের কৌশলের সাহায্যে পরিবেশে বেঁচে থাকে বা বিস্তার লাভ করে। বিস্তার লাভের জন্য তাদের তিনটি প্রধান পন্থা হচ্ছে- (১) বাতাস (২) পানি (৩) শারীরিক সংস্পর্শ। শ্বাসনালীর মাধ্যমে দেহে প্রবেশের জন্য বাতাসই মাধ্যম রূপে কাজ করে। অপর পক্ষে পরিপাক তন্ত্রের সংক্রমণের মাধ্যম হলো পানি। অনেক সংক্রামক, ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পাকস্থলীকে পথ হিসেবে ব্যবহার করে। শীঘ্রই অভিষ্ট অঙ্গে পৌঁছে পাকস্থলীকে পরিত্যাগ করে দেয়। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে পলি ভাইরাস, যা খাদ্য ও পানীয়ের সাথে দেহ অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং আক্রমণ করে অন্যান্য অঙ্গ যেমন স্নায়ুতন্ত্রকে, এবং এর বৈশিষ্ঠ্যমূলক পক্ষাঘাতের সৃষ্টি করে।

মানুষের পৌষ্টিকনালী একটি প্রবেশপথ, যার মাধ্যমে বাইরের অনেক পদার্থ খাদ্যের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।সেইসাথে রোগ সৃষ্টিকারী পরজীবীরা মানুষের পাকস্থলীতে পানির মাধ্যমেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবেশ করে থাকে। পানিবাহিত রোগের মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, পোলিও, হিপাটাইটিস এ ,হিপাটাইটিস ই, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড ইত্যাদি। কলেরা মারাত্মক ধরনের ডায়রিয়ার একটি আদিরূপ; এটি Vibrio cholerae নামক জীবাণুর কারণে ঘটে থাকে। আর এক রকমের জীবাণু (ব্যাসিলাসসমূহ) যেমন শিগেলা, আমাশয় সংঘটিত করে থাকে। এটি এক ধরনের ডায়রিয়া যাকে সচরাচর ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রি বলা হয়ে থাকে। সালমোনেলা নামক একদল জীবাণু অন্ত্রে পানির সাথে প্রবেশ করে সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে ডায়রিয়া না ও ঘটাতে পারে, কিন্তু তাদের আসল রোগ প্রকাশ পায় এক রকমের জ্বর দিয়ে, যাকে বলে আন্ত্রিক জ্বর বা টাইফয়েড।

ডায়রিয়া এবং অন্যান্য পাকস্থলীর পীড়া যে সব পরজীবীর কারণে ঘটে তাদেরকে পানিবাহিত বলে এবং এরা পানির মাধ্যমেই সংক্রামিত হয়। বাংলাদেশে সংঘটিত রোগব্যাধির শতকরা প্রায় পঁচিশ ভাগের কারণই হচ্ছে পানি। এসব রোগের প্রায় শতকরা ১২ ভাগ ডায়রিয়া, এবং শতকরা ১০ ভাগ আন্ত্রিক জ্বরসহ পাকস্থলীর রোগ। এ কারণে এদেশের সামগ্রিক রোগ চিত্রের মধ্যে পানি একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে । ডায়রিয়া এবং পাকস্থলীর অন্যান্য রোগজীবাণু মুখের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে। রোগজীবাণুরা পায়ুপথ দিয়ে পুনরায় পরিবেশে বিমুক্ত হয়, সেখানে এগুলি অবস্থান করে, পরে মুখপথে দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে পুনঃপ্রবেশের সুযোগ পায়।

দেশের জনসাধারণের সামগ্রিক ব্যক্তিগত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ও সচেতনতার মানের উপর অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগজীবাণুর দেহ অভ্যন্তরে পুনঃপ্রবেশের ব্যাপ্তি নির্ধারিত হয়ে থাকে। যেখানে মল নিঃষ্কাশনের ব্যবস্থা অস্বাস্থ্যকর সেখানে জীবাণু বিমুক্ত হয়ে পানিকে দূষিত করে। এই অবস্থা পায়ুপথ থেকে মুখে সংক্রমণের খুব উচ্চমাত্রার সংক্রমণে পর্যবসিত হয়। এথন যেহেতু আমাদের চতুর্দিক পানি কবলিত তাই এই সমস্যাগুলো একেবারেই আমাদের হাতের নাগালে। ব্যাকটেরিয়া একটি এককোষী আন্ত্রিক পরজীবী, যেমন অ্যামিবা এবং Giardia এবং আন্ত্রিক কৃমিসমূহের সংক্রমণ (যেমন ডিম এবং সিস্ট) এই পথে ঘটে থাকে। শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি জনসংখ্যা বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে বসবাস করে। গ্রামগুলিতে ভাল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পানির যথেস্ঠ অভাব রয়েছে । এছাড়া এগুলি নানা রকমের সমস্যায় জর্জরিত যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা, বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ করা খুবই সাধারণ ঘটনা। গ্রামাঞ্চলে সামগ্রিক অবস্থা আন্ত্রিক রোগজীবাণু সমূহের বিশেষ করে মুখ ও পায়ুপথে দ্রুত সঞ্চারণের জন্য খুবই সুবিধাজনক, যা দেশের রোগচিত্র থেকে খুব ভাল করে ফুটে ওঠে। সেই তুলনায় শহরগুলিতে একটু ভালো পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সে ব্যবস্থাও নানা রকমের অপর্যাপ্ততায় সংকীর্ণ এবং তা অন্তর্নিহিত ভাবেই যথেষ্ট ভাল বলা যায় না। যদিও নগরগুলিতে অধিবাসীদের নিজস্ব ব্যবস্থপনায় বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ করা হয়ে থাকে যা নিরাপদ হবার কথা, কিন্তু নিম্ন-রক্ষণাবেক্ষণকৃত পয়ঃনিষ্কাশনের কারণে এবং ময়লাযুক্ত পানি বা জমে থাকা পানির কারনে মশাবাহি বিভিন্ন রোগ দ্বারা আমরা প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হই। যেটার জন্যেও পানি দ্বায়ী । প্রায়শই এই পানি সরবরাহের সময় দূষিত হয়ে যায় এবং বৃষ্টির সময় পানিতে ও বন্যার প্লাবনের ফলে প্রচুর পরিমাণে জীবাণুর অবমুক্তি একটি নিয়মিত ঘটনা।

পানিবাহিত রোগের বিস্তার দমনে পরিশ্রুত পানির সরবরাহ একটি পূর্বশর্ত। পরিশ্রুত পানির ব্যবস্থা করে এবং মলের নিরাপদ নিষ্কাশনের মাধ্যমে এসব রোগ সীমিত রাখা যায়।উন্নত নগরায়ন, সরকারীভাবে সার্বক্ষনিক মনিটরিং ও ব্যক্তিগতভাবে সচেতন থেকে (নলকুপ, গভীর নলকুপের পানি ব্যবহার, পানি ফুটিয়ে খিতিয়ে বা ফিটকিরি) ও এসব রোগব্যধি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু পানিবাহিত রোগের উপর যথেষ্ট প্রভাব শুধু পরিশ্রুত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করলেই হবে না, এর সাথে সাথে মল নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও খুবই জরুরি। এ কারণে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে কম খরচের স্যানিটারি পায়খানা তৈরি ও ব্যবহার ও সচেতনতা। এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই বহুলাংশে সফলতা অর্জন করেছে।

জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে এবং ঝোপ-জঙ্গলের ও স্বতন্ত্র বাস্ত্তভিটের গাছগাছালি অপসারণের ফলে, যেগুলি পরিবারের সুবিধাজনক মলত্যাগের স্থানরূপে ব্যবহার হতো, তা এখন না থাকায় এটা আশা করা যাচ্ছে যে স্যানিটারি পায়খানা গ্রামে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। এসময়ে আমাদের দেশ বন্যা কবলিত হওয়ার কারনে যত্রতত্র মলত্যাগ ও স্যানেটারী পায়খানা পানি কবলিত হয়ে পানির সাথে মিশে ময়লা ও রোগ জীবানু পানিতে টিকে রয়েছে যা শুধুমাত্র মানুষ বা জিবজস্তুর মাধ্যমে বংশ বিস্তারের অপেক্ষা। যা দ্বারা আমরা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছি। পানির নাম জীবন, আবার পানি প্রানঘাতিও হতে পারে। আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   ধর্মান্তর নিষিদ্ধ হচ্ছে ভারতে! নিষিদ্ধ ‘লাভ জেহাদ’   ❖   পানিবাহিত রোগ ও তার প্রতিরোধ   ❖   কুরবানি তাকওয়ার শিক্ষা   ❖   সামাজিক যোগাযোগ কি আমাদের অসামজিক ও অবাধ্য করে তুলছে!   ❖   কোরবানী: তাকওয়া অর্জনের অন্নতম একটি মাধ্যম   ❖   জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই   ❖   র‍্যাগ ডে: বিজাতীয় সংস্কৃতির নতুন উম্মাদনা   ❖   বাংলাদেশ ইসলাম ও আলেম-ওলামার দেশ   ❖   সেইজ দ্যা ডে সংস্কৃতি ও আমরা…   ❖   দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য, দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য