All for Joomla The Word of Web Design
ইসলাম

ইসলাম পূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ধর্ম

শায়খ ড. সাউদ বিন ইবরাহিম আশশুরাইম

আল্লাহ তায়ালার অশেষ দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদের হজের সব হুকুম আহকাম পালন ও পুণ্যময় স্থানগুলোতে অবস্থান এবং অন্য সব আমল সুসম্পন্ন করার তৌফিক দিয়েছেন। নিশ্চয় এ মোবারক পরিসমাপ্তি আমাদের মনের আয়নায় বিদায় হজের দিন দ্বীন পরিপূর্ণ করার যে ঘোষণা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিল, সে চিত্র ফুটিয়ে তোলে। বিদায় হজে রাসুল (সা.) এর মাঝে দুইটি বিষয় ফুটে উঠেছিল। প্রথমটি হলো তাতে রাসুল (সা.) এর মৃত্যুক্ষণ নিকটবর্তী হওয়ার ইঙ্গিত ছিল, যা তিনি নিজেই বিদায় হজের ভাষণে উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেছিলেন এ বলে ‘হে লোক সকল! তোমরা আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে রাখো। কারণ জানি না হয়তো এ বছরের পর আর তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে না।’ দ্বিতীয়টি হলো দ্বীন-ইসলামের পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার ঘোষণা। আল্লাহ বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের ওপর তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার অবদান-অনুকম্পা সম্পূর্ণ করলাম। আর তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করলাম।’ (সূরা মায়েদা : ৩)।

তাফসিরবিশারদরা একমত, আয়াতটি বিদায় হজের দিন অবতীর্ণ হয়েছে। তবে চরম লজ্জার ব্যাপার হলো, কিছু নামধারী মুসলমানের কাছে তাদের ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় এ মহৎ আয়াতটির তাৎপর্য-মহত্ত্ব ও বাস্তবতা অস্পষ্ট থেকে যায়। ফলে তারা তাদের মনে সৃষ্ট কিছু সন্দেহ ও সংশয় নিয়ে বেশ মাতামাতি করে এবং বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখে। সেগুলো দ্বারা তারা তর্ক-বিবাদ বাধিয়ে দেয় এবং সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করে। আবার তাদের মাধ্যমে কতিপয় ইঁচড়ে পাকা-অজ্ঞ ও সুযোগবাদী ধোঁকাক্রান্ত হয়ে ‘অজানা’ বিষয়ে মুখ খোলে। নিজেদের মনোপ্রবৃত্তির কামনা-বাসনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ধারণা করে, ইসলাম নিত্যনতুন সৃষ্ট বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রাখে না। অধুনা সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারে না। তারা আরও মনে করে, ইসলামের খেতাব বা বার্তা-সম্বোধনের পরিবর্তন আবশ্যকীয়। কারণ তা প্রতিটি স্থান, কালে সার্থক ও কল্যাণকর নয় তা প্রমাণ হয় না। অথচ এ আয়াতের অর্থ, তাৎপর্য ও মহত্ত্ব সম্পর্কে মুসলমানের সন্তান এবং ইসলামী পরিবেশে বেড়ে ওঠা ব্যক্তির চেয়ে কিছু অমুসলিম অধিক জ্ঞাত। এর চেয়ে দুঃখ ও হতাশার কথা আর কী হতে পারে!

সহিহ বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, “ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, একজন ইহুদি তাকে বলেন, হে আমিরুল মোমিনিন! কোরআনে একটি আয়াত রয়েছে, যা আপনারা তেলাওয়াত করে থাকেন, আয়াতটি যদি আমাদের (ইহুদিদের) ওপর নাজিল হতো, তাহলে সে আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে আমরা উৎসবের দিন ধার্য করে নিতাম। ওমর (রা.) বললেন, কোন সে আয়াত? প্রত্যুত্তরে ইহুদি বলল, ‘আজ আমি তোমাদের ওপর তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার অবদান-অনুকম্পা সম্পূর্ণ করলাম। আর তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করলাম।” (সূরা মায়েদা : ৩) আয়াতটি। ওমর (রা.) বলেন, ‘আমরা সে দিনটি এবং সে আয়াত রাসুল (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ হওয়ার স্থান সম্পর্কেও জানি। তিনি তখন জুমাবারে আরাফার ময়দানে দ-ায়মান ছিলেন।’

আমরা তা স্মরণ করে, তাৎপর্য ও গভীরতার অনুভূতি ছাড়া শুধু বাহ্যিকতার প্রতি আগ্রহীদের মতো সে আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দিনে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রতি আহ্বান করি না। বরং আমরা আহ্বান করি ও কামনা করি আমরা মুসলিম জাতি যেন আয়াতটিকে নিজেদের জন্য আলোকপ্রদীপ ও অকাট্য দলিল বানিয়ে নিতে পারি, যা দ্বারা কান্ড জ্ঞানহীন ও অবিবেচনাপ্রসূতদের সব নৈরাজ্য-অরাজকতা প্রতিহত করতে পারি। যারা দ্বীন-ধর্ম ত্যাগ করে অন্য কোনো আশ্রয় খোঁজে এবং দাবি করে চলমান পরিস্থিতিতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোর কোনো সুরাহা বা সমাধান ইসলামে নেই।

এ ধরনের যেসব হৈহুল্লোড়-চেঁচামেচি আমরা শুনতে পাচ্ছি এবং আল্লাহর ভয়-ভীতিহীন যেসব লেখালেখি নজরে পড়ছে, শেষ জমানায় তার প্রকাশ ঘটার ব্যাপারে রাসুল (সা.) সতর্ক করে গেছেন। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমাদের যে কেউ বেঁচে থাকবে সে বহুবিধ মতবিরোধ দেখতে পাবে। অতএব, তোমাদের উচিত আমার সুন্নাহ ও খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে অাঁকড়ে ধরা। তোমরা তা অসম দৃঢ়তার সঙ্গে অাঁকড়ে ধরো।’ (আবু দাউদ)। নব আবিষ্কৃত যা কিছু দ্বীনের অবয়ব-সৌন্দর্যকে ক্ষুণ্ন করে। সুন্নতের প্রতীকগুলো মুছে দেয়; নিশ্চিহ্ন করে দেয়। দ্বীনের সঙ্গে তার সংযুক্ত হওয়া, দ্বীনের প্রতি একটা অসহযোগিতা বা অমূল্যায়নতার নামান্তর। এসত্ত্বেও এতসব কিছুর মাঝেও দ্বীন তার অনুসারীদের পূর্ণতা ও কামালিয়তের প্রতি আহ্বান করে। যদি কোনো ব্যক্তি দুইটি বিষয়ের ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ও দোটানায় জড়িয়ে যায়, তাহলে ইসলাম ভালো ও কল্যাণকর দিকটির প্রতি আহ্বান করে। আর যদি হক-বাতিলের মাঝে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তাহলে ইসলাম সত্য ও আলোর পথ দেখায়।

বস্তুত মানুষের প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার দিক বিবেচনা করা হলে, ইসলামকে কঠিনতম ও অধিক কষ্টকর মনে হতে পারে। কেননা প্রবৃত্তির অনুসরণে সহজাতাঙ্গন থেকে অধোনমনের দ্বারা ঊর্ধ্বারোহণ করা যায় না। কারণ ঊর্ধ্বারোহণের ক্ষেত্রে বেশ কষ্ট সাধন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘যদি সত্য তাদের কামনা-বাসনার অনুসারী হতো, নভোম-ল ও ভূম-ল এবং এগুলোর মধ্যবর্তী সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত।’ (সূরা মোমিনুন : ৭১)।

যেহেতু আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলেন, তখন এমন কোনো ভালো ও কল্যাণের দিক বাদ দেননি, যার প্রতি তিনি আহ্বান করেননি এবং এমন কোনো মন্দ দিক রয়ে যায়নি, যা থেকে তিনি সতর্ক করেননি। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা উম্মাহর সব প্রয়োজনীয়তা ও উন্নতি-অগ্রগতি এবং জরুরি বিষয়াদিকে আপন প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দ্বারা সুদৃঢ় প্রাচীরের মতো বেষ্টন করে রেখেছেন, যাতে করে উম্মাহ আল্লাহ তায়ালাকে প্রভু, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মদ (সা.) কে নবী ও রাসুল হিসেবে মেনে নিয়ে শান্তি-সুনিবিড় ছায়াতলে টিকে থাকতে পারে।

তাই উম্মাহর শ্বেত-স্বচ্ছ অবয়বকে পঙ্কিল ও কলুষিত করতে পারে কিংবা উম্মাহর ভিত্তিমূল নড়বড়ে করে দিতে পারে এমন কিছু তার কাছেও ঘেঁষতে পারে না। এ পরিপেক্ষিতে উম্মাহ অসাধু ব্যক্তিদের বিষদাঁতের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকে। শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারীদের নখর-দন্তের আঘাতে জর্জরিত হয় না। উপরন্তু তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়-নিষ্ঠা, ইনসাফ-নিঃস্বার্থতা, ভালোবাসা-সৌহার্দ ও দ্বীনের তরে বিনয়-নম্রতার প্রাণবায়ু সঞ্চার হয়। এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য অর্জনের মাধ্যমে উম্মাহ শত্রুতার ষড়যন্ত্র থেকে বেঁচে থাকবে এবং তাদের ধর্মীয় বাক্য বা কালেমার যেমন এক ও অভিন্ন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, তেমনি রক্তক্ষরণ থেকে নিজেদের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের মত ও আদর্শ এক হবে।

কারণ শত বালামুসিবত ও শত্রুর শত্রুতার দরুন যখন উম্মাহর মাঝে রোগব্যাধি পরিলক্ষিত হয়, তখন তা পুরো উম্মাহ এক দেহ ও অভিন্ন শরীরের মতো হওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় প্রমাণ বহন করে যে, এক ও অভিন্ন দেহকে রোগবালাই’র বিভিন্নতা ও প্রবৃত্তির পীড়া-যন্ত্রণা ছিন্নভিন্ন এবং খন্ড খন্ড করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদাররা তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের স্পষ্ট শত্রু।’ (সূরা বাকারা : ২০৮)।

অনুবাদ : মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন

১৯ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   বাসচাপায় প্রাণ হারালেন মামা-ভাগনে   ❖   ‘দৈনিক বিশ্ব ইজতেমা’— দেশজুড়ে ইজতেমার ধ্বনি   ❖   ২০২১ সালে বিশ্ব ইজতেমার দুই পর্বের তারিখ নির্ধারণ   ❖   আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমা ২০২০   ❖   বিমান বিধ্বস্ত নিয়ে মিথ্যাচার: খামেনির পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ   ❖   প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে মুনাজাতে অংশ নেন   ❖   মোদি-অমিত বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুকে সমর্থন করলে মামলা তুলে নিবে:‌ জাকির নায়েক   ❖   প্রথমবারের মত ইরান সফরে কাতারের আমির   ❖   যুগে যুগে তাবলিগ   ❖   ইজতেমা—ইমান জাগার সম্মেলন