All for Joomla The Word of Web Design
ইসলাম

সত্যানুরাগী ইমাম জাফর সাদেক (রহ.)

রোকেয়া মামুন

লেখিকা, আলেমা

নবী বংশের এ মহান ইমামের ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য সাধারণ। বংশের মতো তার চরিত্রেও ছিল সম্ভ্রান্তের ছাপ। আমর ইবনে আল মিকদাম (রহ.) বলেন, ‘ইমাম জাফর (রহ.) কে দেখেই বোঝা যেত তিনি নবী পরিবারের সন্তান। তার চারিত্রিক মাধুর্য ও ব্যক্তিত্ব ছিল খুবই উন্নত ধরনের।’

ইতিহাসে তিনি ‘ইমাম জাফর সাদেক’ নামে প্রসিদ্ধ। তার পুরো নাম আবু আবদিল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আল বাকের (রহ.)। আবু মুহাম্মাদ তার উপনাম এবং ‘সাদেক’ তার উপাধি। আরবি শব্দ সাদেক অর্থ সত্যবাদী। জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন, পুরো জীবনে তিনি কখনও মিথ্যা বলেননি। তাই তাকে ‘সাদেক’ তথা সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তার দাদা আলী (রহ.) ছিলেন হজরত হোসাইন (রা.) এর ছেলে এবং আলী (রা.) এর নাতি। অর্থাৎ চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) এর বংশধারায় পঞ্চম পুরুষ তিনি। তার মা ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর নাতি কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ (রহ.) এর মেয়ে উম্মে ফারওয়া ফাতেমা (রহ.)। মা-বাবা উভয়ের দিক থেকেই সম্মানিত বংশের এ মহান মনীষী ৮০-৮৩ হিজরি সনের ১৭ রবিউল আউয়াল মতান্তরে ৭০২ ঈসায়ী সনের ২৪ এপ্রিল শুক্রবার ফজরের পর মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ, প্রথম খ-, ১৬৬ পৃষ্ঠা)।
তার বাবা ইমাম বাকের (রহ.) ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠ আলেম এবং ফকিহ। ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন ইমাম বাকের (রহ.) এর ছাত্র। এ থেকেই প্রমাণিত হয় তার বাবা কত বড় আলেম ছিলেন। সুতরাং ‘ইলম’ তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন একথা বলাই বাহুল্য। বাবার মতো তিনিও জ্ঞানের রাজ্যে রাজত্ব করেছেন একচেটিয়া। তাই তো যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসরা একবাক্যে ইমাম হিসেবে মেনে নিয়েছেন জাফর সাদেক (রহ.) কে। ইমাম জাহাবি (রহ.) তাকে শীর্ষস্থানীয় ইমাম এবং ইবনে হিব্বান (রহ.) সবচেয়ে বড় ফকিহ বলে উল্লেখ করেছেন নিজ নিজ গ্রন্থে। ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, ‘জাফর সাদেক (রহ.) এর ইমামত, জালালত ও মর্যাদা সম্পর্কে সব হকপন্থী আলেম একমত।’ (তাহজিব আল আসমা ওয়াল লুগাত, প্রথম খ-, ১৫০ পৃষ্ঠা)।
নিজের ঊর্ধ্বতন পুরুষ নবীজি (সা.) এর হাদিস বর্ণনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম। প্রখ্যাত হাদিস সমালোচক ইমাম জাহাবি এমই বলেছেন। ইবনে সাদাত লিখেছেন, ‘কানা কাসিরুল হাদিস’ অর্থাৎ ‘তিনি ছিলেন অনেকসংখ্যক হাদিসের ধারক ও বাহক। (আত-তাহজিব, দ্বিতীয় খ-, ১০৪ পৃষ্ঠা)। এ মহান মনীষী হাদিস শিখেছেন স্বীয় বাবা বাকের (রহ.) এর কাছ থেকে। এছাড়াও যাদের থেকে তিনি হাদিস রেওয়াত করেছেন, তারা হলেন মুহম্মাদ ইবনে মুনকাদির, উবায়দুল্লাহ ইবনে আবি রাফি, ইমাম জুহরি প্রমুখ। তার ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইয়াহইয়া আল কাত্তান, সুফিয়ান সাওরি, সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নাসহ (রহ.) প্রতিযশা আরও অনেক আলেম। হাদিসে রাসুলের প্রতি তিনি ছিলেন বিশেষ যত্মবান। পবিত্রতা ছাড়া তিনি কখনও হাদিস পড়াতেন না; এমনকি রেওয়াতও করতেন না। হাদিস পড়ানোর সময় ছাত্রদের বলতেন, ‘তোমরা আমার থেকে হাদিস শিখে নাও। কেননা আমার পর এভাবে আর কেউ তোমাদের হাদিস শেখাবে না। (আত-তাহিজব, দ্বিতীয় খ-, ১০৩ পৃষ্ঠা)। ইমা আবু হানিফা (রহ.) প্রায় বলতেন, ‘জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (রহ.) এর চেয়ে বড় ফকিহ আমি আর দেখিনি।’ (তাজকিরাতুল হুফফাজ, প্রথম খ-, ১৬৬ পৃষ্ঠা)।
নবী বংশের এ মহান ইমামের ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য সাধারণ। বংশের মতো তার চরিত্রেও ছিল সম্ভ্রান্তের ছাপ। আমর ইবনে আল মিকদাম (রহ.) বলেন, ‘ইমাম জাফর (রহ.) কে দেখেই বোঝা যেত তিনি নবী পরিবারের সন্তান। তার চারিত্রিক মাধুর্য ও ব্যক্তিত্ব ছিল খুবই উন্নত ধরনের।’ তিনি সবসময় ইবাদতে ডুবে থাকতেন। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘আমি অসংখ্যবার ইমামের কাছে আসা-যাওয়া করেছি। যখনই তার কাছে আসতাম তাকে রোজা অথবা কোরআন তেলাওয়াতরত অবস্থায় পেতাম।’ হাইয়্যাজ ইবনে বুসতাম (রহ.) বলেন, ‘ইমাম জাফর সাদেক (রহ.) বড় আবিদের পাশাপাশি একজন বড় দানবীরও ছিলেন। প্রায় সময় তিনি সব খাবার বিলিয়ে পরিবারসহ উপোস থাকতেন।’
সাহসীকতা ও দৃঢ় মানসিকতা ছিল জাফর সাদেকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সত্য বলতে, তিনি কখনও দ্বিধা কিংবা মারপ্যাঁচের আশ্রয় নিতেন না। একবার আব্বাসীয় শাসন আমলে স্বৈরাচার খলিফা মানসুরের দরবারে ইমাম জাফর উপস্থিত হন। ইমামকে দেখে খলিফা বলেন, জাফর সাদেক! সকাল থেকেই একটি মাছি আমাকে খুব বিরক্ত করছে। তাড়িয়ে দেয়া সত্ত্বেও মাছিটি বারবার আমার গায়ে এসে বসছে। আচ্ছা বলুন তো, আল্লাহ কেন মাছি নামক যন্ত্রণাদায়ক প্রাণীটি সৃষ্টি করলেন? ইমাম সহজ ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, স্বৈরাচারদের সায়েস্তা করার জন্য। (সাফাওয়াতুস সাফাওয়া, ১৩১ পৃষ্ঠা)।
উম্মতের জন্য বিশাল দরদি হৃদয় ছিল ইমাম জাফর সাদেকের। তিনি সবসময় বলতেন, তোমরা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং তর্কবিতর্ক করবে না। এ একটি কাজই তোমাদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। মনে রেখো! ধর্মীয় ব্যাপারে তর্কবিতর্ক অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং ইবাদতের সময় নষ্ট করে। তিনি আরও বলতেন, কখনোই কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে খারাপ ধারণা পোষণ করবে না। তোমার কোনো ভাই থেকে যদি খারাপ কিছু প্রকাশ হয়েও যায় তবে এর বিপরীতে ৭০টি কারণ বা ব্যাখ্যা বের করবে, যাতে ওই ভাইয়ের প্রতি কুধারণা সৃষ্টি না হয়। তাতেও যদি যথেষ্ট না হয়, তবে ভাববে এর জন্য অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে, যা তুমি বুঝতে পারছ না। মানব দরদি ও শিক্ষানুরাগী মহান মনীষী ইমাম জাফর সাদেক (রহ.) ১৪৮ হিজরি সনের ২৫ শাওয়াল
শাহাদতবরণ করেন।

 

৪৫ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   বাসচাপায় প্রাণ হারালেন মামা-ভাগনে   ❖   ‘দৈনিক বিশ্ব ইজতেমা’— দেশজুড়ে ইজতেমার ধ্বনি   ❖   ২০২১ সালে বিশ্ব ইজতেমার দুই পর্বের তারিখ নির্ধারণ   ❖   আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমা ২০২০   ❖   বিমান বিধ্বস্ত নিয়ে মিথ্যাচার: খামেনির পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ   ❖   প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে মুনাজাতে অংশ নেন   ❖   মোদি-অমিত বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুকে সমর্থন করলে মামলা তুলে নিবে:‌ জাকির নায়েক   ❖   প্রথমবারের মত ইরান সফরে কাতারের আমির   ❖   যুগে যুগে তাবলিগ   ❖   ইজতেমা—ইমান জাগার সম্মেলন