All for Joomla The Word of Web Design
ইদানিং ভাবনা

কিভাবে আরব বিশ্ব এড়াতে পারে রসাতলযাত্রা?

নাবিল ফাহমি

মিশরের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে নিযুক্ত সাবেক মিশরীয় রাষ্ট্রদূত। তিনি এখন কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের (এসিইউ) অধ্যাপক।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ মাসুমুর রহমান খলিলী

নভেম্বরে নৈরাশ্যজনক সিরিজ ঘটনা আরব বিশ্বে তমাশাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে প্রবলভাবে। বিদেশে থাকা অবস্থায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দেন, কিন্তু পরে দেশে এসে সেটি স্থগিত করেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ অভিমুখে ইয়েমেন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। সৌদি আরবে এমন এক দুর্নীতিবিরোধী প্রচারাভিযান পরিচালিত হয় যেখানে বেশ কয়েকজন নেতৃস্থানীয় উচ্চপদস্থ রাজ ব্যক্তিত্বকে আটক করা হয়। আর মিশরের সিনাইয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে । লিবিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে ক্রীতদাস নিলামের ভিডিও ফুটেজ, যাতে মনে হচ্ছে রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছে।
ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সাময়িক জয়লাভ এবং গাজা আর পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা এই অঞ্চলের সমষ্টিগত উদ্বেগকে উপশম করার জন্য সামান্যই কাজ করেছে। আর এই ইতিবাচক উন্নতি তেমন একটা আত্মবিশ্বাসও সুষ্টি করেনি যে আরব বিশ্বের রসাতল গমন এতে ঠেকে যাবে। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক এবং ইয়েমেনে বিদেশী হস্তক্ষেপ এখন রুটিন বিষয় হয়ে ওঠেছে। আর পরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক চলমান রয়েছে। লেভান্টের সীমানা যেন কবরের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সামনে সেখান থেকে আসছে অ্নেক মৌলিক চ্যালেঞ্জ।।
প্রকৃতপক্ষে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির বিস্ময়ের বিষয় হলো যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনও আরব দেশই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যু নিষ্পত্তি করা আর লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের সমাধান করার জন্য সেভাবে চেষ্টা করছে না। এই দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে বিদেশিরা আরবদের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে ক্রুসেড থেকে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ পর্যন্ত বহু বৈদেশিক আক্রমনের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে মধ্য প্রাচ্য। এর প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করা হয়েছে এবং স্নায়ু যুদ্ধের সময় ছায়া যুদ্ধের এক নাট্যমঞ্চ ছিল এ অঞ্চল। এমনকি আজও, আরব অঞ্চল দখলদারিত্বের মধ্যেই থেকে গেছে।
এই অঞ্চলের দুর্দশার জন্য বিদেশী শক্তিগুলিকে দোষারোপ করার হয়তো অনেক কারণ রয়েছে, কিন্তু অন্যকে দোষারোপ করে এমনকি একে অপরকে দোষারোপ করে এখানকার কোন কিছুরই সমাধান করা যাবে না। সর্বোপরি, আরব বিশ্বে অদক্ষ এবং অকার্যকর শাসন, অশুভ জোট এবং জাতীয় ক্ষমতার অনুন্নয়নসহ অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট অনেক সমস্যা রয়ে গেছে।
দুর্যোগ যে কোন অঞ্চলের জন্য অপেক্ষমান থাকে যদি সেখানকার অধিকাংশ নাগরিক তাদের ভবিষ্যতকে অবয়ব দেয়ার ক্ষেত্রে অসহায় বোধ করে। আরব বিশ্ব ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল, এর প্রায় ৭০ ভাগ এর নাগরিক ৩৫ বছরের কম বয়সী এবং বেশিরভাগ দেশে বেকারত্বের হার বেশ উচুঁ। এটি শুধুমাত্র সম্পদের অসাধারণ অপচয়ই নয়, একই সাথে একটি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক-সমাজতাত্ত্বিক সমস্যাও তৈরি করেছে। আর অঞ্চলটি যে অভ্যন্তরীণ অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন তার মধ্যে এটি একটি।
আরবদের অবশ্যই তাদের নিজস্বভাবেই এজেন্ডা নিতে হবে এবং তাদের ভবিষ্যত নির্ধারণে প্রাথমিক শক্তি হয়ে উঠতে হবে তাদের নিজেদেকেই। তাদের অবশ্যই বাহ্যিক জগতের সাথে যুক্ত থাকতে হবে আর তাদের কৌশলগত সম্পর্ক ও জোটকে শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু তাদের অন্যদের উপর নির্ভরশীল হতে হবে কম মাত্রায়।
এই অঞ্চলের সরকারগুলিকে বিদ্যমান হুমকি এবং আধিপত্য বিস্তারের সম্প্রসারণবাদি থাবা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে হবে। এতে করে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের আঞ্চলিক সমস্যা মোকাবেলা ও সামরিক দ্বন্দ্বকে প্রতিরোধ করতে তাদের আরো কূটনৈতিক সক্ষমতার যোগান দেবে।
এর সাথে সাথে, আরবদের তাদের জাতীয় পরিচয়ও রক্ষা করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের জাতি-রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিখুঁত নয়, তবে এটি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে আরও বেশি হুমকির সম্মুখিন করার মতো ধর্মীয় বা জাতিগত সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি ভালো। স্থিতির এই হুমকি এড়াতে এ অঞ্চলের বিদ্যমান জাতি-রাষ্ট্র গুলোতে শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে যেখানে সুশাসন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যাবে। দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ আরব দেশের প্রতিষ্ঠান এই অপরিহার্যতা পূরণের ধারেকাছেও নেই।
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আরবদের এটি স্বীকার করতে হবে যে, বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করার জন্য জাতীয় স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে চালিত অভ্যন্তরীণ সংস্কার সবচেয়ে ভাল উপায়। গত কয়েক বছর ধরে দেখা গেছে আরব জাগরণ একটি মধ্যপন্থী মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সামনে এনেছে যারা পরিবর্তনে ভুমিকা রাখে। সুবিধাবাদী পক্ষগুলো হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার পরিবেশ থেকে লাভবান হবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এটি সত্য যে এই আন্দোলনগুলি মন্দ শাসন এবং আরব নেতাদের ক্রমবর্ধমান সংস্কারে ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া থেকে শক্তি অর্জন করেছে।
আরবদের নিজেদের জন্য একটি বৃহৎ পরিসরের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিকল্প উপস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে যাতে তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে পারে। পৃথিবী এখন আর দ্বিমেরু বা ইউরোপীয় কেন্দ্রিক নয়। প্রকৃতপক্ষে এটি কেবলমাত্র যুদ্ধোত্তর ভূ-রাজনৈতিক দিগ পরিবর্তনে সৃষ্ট ওয়েস্টফালিয়ান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফল নয় যা দ্রুত প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন দ্বারা পরীক্ষা হচ্ছে।
শেষত, আরব বিশ্বের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং আরব ভূমির উপর অবৈধ দখল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে জনগণের আকাঙ্খার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। কৌশলগত বা লেনদেনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই কিছু করার চেষ্টা হলে তা কেবল স্বল্পমেয়াদি পরিত্রাণ হয়তো দিতে করে। কিন্তু মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ কোন নীতি চূড়ান্তভাবে সফল হবে না।
আরব দেশগুলির আগামীতে স্বতন্ত্র এবং সমষ্টিগতভাবে, তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বিদ্যমান বিদেশী ও অভ্যন্তরীণ হুমকি মোকাবেলার জন্য সম্পূর্ণ পরিকল্পিত একটি কৌশল প্রয়োজন। আরব নেতাদের আন্তঃআরব সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরা এবং আঞ্চলিক সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাদের অ-আরব প্রতিবেশীদের সাথে জড়িত করার পরিকল্পনার জন্য এটিই উচ্চ সময়। শেষ কিন্তু বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আরব নেতাদের অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে যে তারা কিভাবে তাদের জনগণের জন্য অভ্যন্তরীণ শাসনকে আরও উন্নত করবেন।
আরব বিশ্ব যদি তার নিজের ভবিষ্যতের অবয়ব দিতে চায়, তবে এখন এ নিয়ে উদাসীন থাকলে চলবে না। এর নেতা এবং জনগণকে এখনই পরিকল্পনা শুরু করতে হবে।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   মানুষ কি ‘বিবেকবান প্রাণী’?   ❖   তদবির ও ভিপি নুরের টাকা লেনদেনের ফোনালাপ ফাঁস (অডিও)   ❖   নেদারল্যান্ডসকে প্রধানমন্ত্রী: মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন   ❖   নান্দনিক এক মসজিদ উপহার   ❖   ‘মজলিসে দাওয়াতুল হক’-এর ইজতেমায় আমন্ত্রণ   ❖   আব্বু, আমিও পড়ব   ❖   ডিএমপি’র ১৮ পুলিশ পরিদর্শককে বদলি   ❖   ওবায়দুল কাদেরকে পুলিশ ছাড়া রাজপথে নামার চ্যালেঞ্জ   ❖   ধনেপাতা ইনসুলিন, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণসহ ৭ রোগের মহৌষধ   ❖   আবারো সেই হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যু!