All for Joomla The Word of Web Design
বইপত্র

“চাঁদের পাহাড়” গ্রন্থটির পাঠোপলব্ধি

বইয়ের নাম: চাঁদের পাহাড়
লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনা: এম. সি. সিরকারি এন্ড সনস লিমিটেড
প্রকাশকাল: ১৯৩৭ ঈ.
পৃষ্ঠা: ৬৯
মূল্য: ১৫০ টাকা
ধরন: উপন্যাস

পাঠ সংক্ষেপ:
দরিদ্র পরিবারের ছেলে শঙ্কর। পড়ালেখায় যতটুকু না পারদর্শী তারচে’ বেশি পারদর্শী ভূগোল, ম্যাপ, রাশিচক্র ইত্যাদিতে। পড়ালেখা শেষ করেই মায়ের অনুরোধে একটা পাটকলে চাকরি নেয়। কিন্তু এখানে ওর মন বসে না। সে চায় পৃথিবীটা ঘুরে দেখতে, রহস্য এবং রোমাঞ্চ খুঁজে বেড়াতে। একদিন তার স্বপ্ন সত্যি হলো। পাশের বাড়ির একজনের সাহায্যে পাড়ি দিলো আফ্রিকায়। মোম্বাসা থেকে মাইল ত্রিশ দূরে উগান্ডা রেলওয়ের নুডসবার্গ স্টেশনে কেরানির চাকরি পেলো। জনমানবহীন বিশাল প্রান্তরে স্টেশনটি। তারই পাশে জনা কয়েক কুলির সঙ্গে তাঁবু খাটিয়ে থাকতে লাগলো শঙ্কর। এমন নির্জন প্রান্তর আগে কখনো দেখেনি। খুবই সহস্যময়, বিস্ময়কর মনে হয় তার কাছে। রাতে ঘুমুতে পারে না সিংহের বিকট গর্জনে। রহস্যে ঘেরা আঁধার দেখে কাটায় রাত। ক’দিন পর থেকে শুরু হয় সিংহের উৎপাত। কয়েকজন কুলি খাদ্য হয় সিংহের। একবার স্টেশনমাস্টারের বন্দুক দিয়ে ওদের মোকাবেলাও করে শঙ্কর। সিংহও পাল্টা আক্রমণ করে। অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যায় সে। এর মধ্যেই অন্য আরেকটি স্টেশনে বদলি হয় শঙ্কর। প্রথম খুশি হলেও সেখানে গিয়ে তা মিইয়ে যায়। এটা আরোও বিজন, নির্জন। পুরো স্টেশনে ওই একমাত্র মানুষ। সিংহ ও নেকড়ের উৎপাত আরো বেশি এখানে। দিনে দু’বার মাত্র ট্রেন আসে। আশপাশে খাবার জল পর্যন্ত নেই। ট্রেন থেকে জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে যায়। রেলের গার্ডকে বলে একটা বন্দুক আনিয়ে রাখে সে। এক রাতে ব্লাক মাম্বা সাপের আক্রমণ থেকে নিজ বুদ্ধিতে মুক্তি পায়। এতো বিপদের পরও এই বিজন প্রান্তরটি বড্ডো ভালো লাগে তার। একদিন দূরের এক ঝরনা থেকে গোসল করে ফেরার পথে গাছের নিচে এক বৃদ্ধকে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে থাকতে দেখে সে। জলতেষ্টায় প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে যেনো। শঙ্কর তাকে তুলে নিয়ে আসে স্টেশনের ওর কামরায়। সারারাত সেবা করার পর শেষরাতে কিছুটা সুস্থ হয়। লোকটির উন্নত পেশি আর শক্ত শরীর দেখে শঙ্কর অনুমান করলো, সে কোনো সাধারণ লোক নয়। অনুমান সত্যি হলো। পর্তুগিজ নাগরিক সে। নাম ডিয়েগা আলভারেজ। বন জঙ্গলে ঘুরে সোনার খনি খোঁজা তার চিরাচরিত অভ্যাস। সে শঙ্করের কাছে তার অভূতপূর্ব এক এডভেঞ্চার কাহিনী শোনালো। সে ও তার বন্ধু জিম কর্টার মিলে দক্ষিণ আফ্রিকার রেখটালসভেল্ট পর্বতের গহিন অরণ্যে সোনার খনি খুঁজে বেড়িয়েছিলো এতোটা দিন। একটা নদীর পারে একখণ্ড হলুদ হীরেও পেয়েছিলো। কিন্তু সেখানের বিশালদেহী জীব ‘বুনিপে’র (যাকে সেখানের উপজাতিরা ‘উপদেবতা’ বলে) আক্রমণে জিম কার্টার মারা যায়। জায়গাটি এতই দুর্গম আর বিপদসঙ্কুল যে, খনি আছে জেনেও সেখানে যাওয়ার সাহস কেউ করে না।
পরদিন বৃদ্ধ সুস্থ হলে শঙ্করকে তার সঙ্গে খনি খুঁজতে যেতে বলে। শঙ্কর ভেবে দেখলো, রেলের কাজ করে বেশি টাকা আয় করা দুষ্কর। তার ওপর আগে থেকেই রহস্যময় ভ্রমণের নেশা পেয়ে বসেছিলো তাকে। খনির সন্ধানে বৃদ্ধের সঙ্গে রওনা করলো সেই দুর্গম, রহস্যে ঘেরা রেখটালসভেল্ড পর্বতে। দিন যায়, মাস যায়। ওরা চলতে থাকে। পথে পথে সমূহ বিপদ। হিংস্র জানোয়ার আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েও বেঁচে যায় অনেকবার। ধাঁধায় পড়ে একই স্থানে ঘুরেছিলো কয়েকদিন। শিকার করতে গিয়ে পথও হারিয়েছিলো শঙ্কর। আলভারেজ ওকে বলেছিলো, ‘একা কোথাও গেলে জায়গায় জায়গায় কিছু একটা চিহ্ন রেখে যাবে। যাতে ফেরার সময় পথ চিনতে ভুল না করো।’ বিভিন্ন চড়াই উৎরাই করে একদিন পৌঁছুলো পর্বতের চূড়ায়। কিন্তু আলভারেজ খনি কুঁড়িয়ে পাওয়া সেই নদীটা আর খুঁজে পেলো না। ওরা প্রায় হতাশ হয়ে পড়লো। এক রাতে একটি অগ্নিগিরি ফেটে পড়লো। ওরা সে পাহাড়ের পাদদেশেই তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। জ্বলন্ত আগুনের গোলা আর উৎকট পোড়া গন্ধে ভরে যায় চারপাশটা। পালিয়ে বেঁচেছিলো সেদিন। একরাতে সেই ভয়ঙ্কর বুনিপের হাতেই আলভারেজ মারা পড়লো। রহস্যময় জন্তুটিকে শঙ্কর দেখেনি, শুধু পায়ের ছাপ দেখেছে। বন্ধুকে হারিয়ে ফেরার পথ ধরলো শঙ্কর। পথে একটি বিশাল গুহা দেখে ঢুকে পড়ে তাতে। একসময় পথ হারিয়ে মরতে বসে। পাঁচদিন পর জলের সন্ধান পায় ভেতরে। সে জলের স্রোত ধরে গুহার বাইরে বেরোনোর পথ খুঁজতে লাগলো। পথ যাতে আবার ভুল না করে তাই আলভারেজের উপদেশ কাজে লাগালো। জলে পড়ে থাকা নুড়ি পাথর নিয়ে চিন্হ দিতে দিতে একসময় সে গুহা থেকে বেড়িয়ে আসলো। তখনো একটি পাথর তার পকেটে ছিলো। এবার সে পথ চলতে লাগলো বিশাল কালাহারি মরুভূমি দিয়ে। মরুভূমিতে জলের অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়লো একসময়। একটি ছোট্ট গুহায় আশ্রয় নিতে গিয়ে পড়লো আরেক বিস্ময়ের সামনে। আড়াআড়িভাবে শোয়ানো একটি মনুষ্য কঙ্কাল চোখে পড়ে। পাশে পড়ে আছে ছিপি লাগানো একাটা বোতল। তাতে সামান্য পানি। ছিপি খুলে একটা চিঠি পায়। চিঠি পড়ে কঙ্কালের পরিচয় ও এডভেঞ্চার ভ্রমণের কথা জানতে পারে সে। ইতালীয় নাগরিক। নাম আত্তিলিয় গাত্তি। সেও খনি খুঁজতে রিখটালসভেল্ড পর্বতে গিয়েছিলো এবং সেখান থেকে কিছু হীরে নিয়েও এসেছি। কিন্তু সঙ্গীদের আক্রমণের কারণে সেগুলো নিয়ে আর যেতে পারেনি দেশে। প্রায় ত্রিশ বৎসর এখানেই পড়ে রয়েছে। শঙ্কর কঙ্কালের বুটের ভেতর পাঁচটি হীরে পায়। পকেটে থাকা নুড়ি পাথরের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখে সবগুলো একরকম। তার মানে, গুহার ভেতর পাথরের যে চিহ্ন করেছিলো, সেগুলোও ছিলো হীরে! শঙ্কর লোভে পড়লো না। কারন, জায়গাটি এত ধাঁধাময় যে, দ্বিতীয়বার যাওয়া মুশকিল। শঙ্কর সেগুলো নিয়েই মরুভূমি পার হয়ে চিমানিমানি পর্বতে পৌঁছুয়। কিন্তু হাঁটুতে ব্যথা পেয়ে প্রায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। শত শত শকুন আর নেকড়ে ওর লাশ খাওয়ার আশায় বসে থাকে প্রতিদিন। কেউ হীরে নিয়ে ফিরতে পারেনি, সেও হয়তো পারবে না- এটাই ভেবে নিয়েছিলো। কিন্তু একদল সার্ভে টিমের সাহায্যে একদিন রোডেশিয়ায় পৌঁছুয়। সুস্থ হয়ে সাড়ে বত্রিশ হাজার টাকায় চারটে হীরে বিক্রি করে। বাকি দুটো মা’কে দেখাবে বলে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।

উপলব্ধি:
এ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের যতগুলো উপন্যাস পড়েছি, তার মধ্যে এ বইটি সবার সেরা মনে হয়েছে। লেখক স্থানগুলোতে না গিয়ে এতো তত্ত্ব ও তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, বইটি না পড়লে বুঝা দুষ্কর। গবেষণালব্ধ বইটিতে লেখকের বুৎপত্তি ঠিকরে পড়ছে। প্রতিটি পাতায় পাতায় যেন সাহিত্যের মুক্তো ছড়ানো রয়েছে। লেখক বইটিতে এতো রোমাঞ্চ ও রহস্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন যে, পাঠকের মনে হবে সব তার সামনেই ঘটছে। এমন বই বাংলা সাহিত্যে বিরল। বইটি সকলের পড়া ও সংগ্রহে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।

 

মাই নিউজ/মাহদী

৫৩৫ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   রাস্তার ছেলে   ❖   সাধারণ রোগীরা কি চিকিৎসা পাচ্ছে?   ❖   বাজেট দিয়ে কী হবে?   ❖   তুরষ্ক পাঠ্যবইয়ে জিহাদ ঢুকিয়েছে, বের করেছে বিবর্তনবাদ   ❖   আরব আমিরাতের করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় ভাইস প্রেসিডেন্টের অনলাইন বৈঠক !   ❖   চার্জ ফ্রি রেমিট্যান্স প্রেরণ সুবিধা চালু করল ব্যাংক এশিয়া   ❖   তিনি কত দয়ালু এবং ক্ষমাশীল   ❖   খিদমাহ ফাউন্ডেশনের চান্দিনায় ইফতার ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ   ❖   সম্পত্তির লোভে বাবাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত   ❖   করোনা মৃত্যুতে ইউরোপে শীর্ষে ব্রিটেন