All for Joomla The Word of Web Design
বইপত্র

“বলয় ভাঙার গল্প” গ্রন্থালোচনা

সালেহ খান বাবলু
নিয়মিত লেখক

বই: বলয় ভাঙার গল্প
লেখক: ড. উম্মে বুশরা সুমনা
প্রকাশনী: জ্ঞানবিতান
প্রকাশকাল: বইমেলা ১৮’
মুদ্রিত মূল্য: ২৭০ টাকা
পৃষ্ঠা: ১৭৪

পর্যালোচনা:
প্রতিটি জীবনই একেকটি গল্পসমষ্টি। জীবনের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে গল্প।
তবে জীবনের গল্পগুলো এবং গল্পের জীবনগুলো বিচিত্র রকমের। সেই গল্পগুলোতে মানুষ অভিনয় করে। গল্পগুলো মানবজীবনে জেঁকে বসে। ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবনে ও যৌবনে। হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, ভালো লাগা ও ভালোবাসার অজস্র গল্পবৈভবে ভরপুর মানবজনম। অনাহূত সেই গল্পগুলো সংসার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিস্তর প্রভাব ফেলে। সেই সুযোগে সমাজ আমাদের মাঝে গল্পচ্ছলে প্রচুর কুপ্রথা, কুসংস্কার, বেদস্তুর, বিভাজ্য, বৈষম্য, অপসংস্কৃতি, পাশ্চাত্যকালচার ছড়িয়ে দেয়। এটাই হচ্ছে সমাজের বলয়। সেই বলয়-ই সভ্যতা, নৈতিকতা ও আধুনিকতার রূপে আমাদের জীবনে ছড়িয়ে দেয় জাহেলিয়াতের বিষবাষ্প। জ্বালিয়ে দেয় বিদ্বেষবিষের স্ফুলিঙ্গ। তখন আলোকিত মুখোশের আড়ালের অন্ধকারে ছেয়ে যায় মানবজমিন। বিদ্বেষবিষের স্ফুলিঙ্গে ভষ্ম হয়ে যায় জীবনের প্রতিটি উপসর্গ। জীবনে তখন আলোর গল্প কিংবা গল্পের আলো থাকে না। ঠিক তখন বিবেককে জাগ্রত করতে, আবেগকে নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং মনুষ্যত্বের আলোয় উদ্ভাসিত হতে প্রয়োজন পড়ে আরো কিছু গল্পের। আর সেইসব গল্পই বাস্তব এবং সেইসব বাস্তবতাই গল্প। তাই সেইসব গল্পে সভ্য সমাজের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা অসভ্যতার দেয়াল ধ্বসে পড়ে। নৈতিকতার আবরণে ঢাকা অনৈতিকতার কলুষিত মুখোশ খসে পড়ে। উন্মোচন হয় সমাজের কুত্‍সিত মুখাবয়ব। উন্মোলন হয় মানুষের অন্তর্চক্ষু। মূলত সেইসব গল্পই ভেঙে দেয় সমাজের বলয়। সেইসব একগুচ্ছ গল্প নিয়েই ‘বলয় ভাঙার গল্প’ বইটি। অন্ধকারের বলয় ভেঙে যাঁরা আলোকিত হতে চায়, এবং সেই আলোর দ্যুতি সমাজে বিলিয়ে দিতে চায় তাঁদেরকে উত্‍সর্গ করেই বইটি।

বইটি মূলত গল্পের।
তবে ভিন্ন ভাবধারার।
ছোট ছোট গল্প। প্রায় ত্রিশটি গল্প একত্রকরণে বইটি ‘বই’ হয়েছে।
প্রতিটি গল্পের শেষে টিকা সংযোজিত। সেখানে রেফারেন্সসহ গল্পের সারনির্যাস। ফ্ল্যাপে লেখকপরিচয় এবং বই সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তুলে ধরা হয়েছে।
ধর্মপরিচর্যার অভাবে আমাদের সমাজ আজ উদ্ভূত সমস্যাসমুদ্রে ভাসমান। যা পরিলক্ষিত হয় বইয়ের প্রতিটি গল্পে। গল্পটিকায় লেখক ইসলামের মাধ্যমে সেইসব সমস্যা প্রতিকারের পথ বাতলে দিয়েছেন। প্রমাণ করেছেন ইসলামই পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। পৌরাণিক কোরআন-হাদিস যে কত আধুনিক তা জানা যায় গল্পের টিকাগুলো পড়ে। কোরআন যে কত নিখুঁত ও নিপুণভাবে উদ্ভূত সমস্যা নিরসন করে তাও গল্পের টিকা পড়ে বোঝা যায়। ইসলামবিবর্জিত সমাজ যে কতটুক ভয়াল তা চোখ খোলে তাকালেই দৃশ্যমান। তাই জীবনে শান্তির নির্মল বাতাস প্রবাহিত করতে প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের ইসলামকে অনুসরণ করতে হবে। তাহলেই সমাজের অন্ধকার বলয় ভেঙে সোনালি সূর্য ভেসে উঠবে।

আলোচ্য বইটির প্রতিটি গল্পই নিরঙ্কুশ সুন্দরের বার্তাবহন করে। ভেঙে দেয় অন্ধকারের বলয়। ছড়িয়ে দেয় ঐশীধ্বনি। চূর্ণবিচূর্ণ করে অসভ্যতার প্রাচীর। পাকাপোক্ত করে মহাসত্যের ভীত।
দূরীভূত করে কুপ্রথা-কুসংস্কার। সর্বোপরি প্রচার করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ
বিধি-বিধান।

বইটির প্রচ্ছদ অত্যন্ত মনোহর। বাইন্ডিং মজবুত। মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়লেও তা হাতেগণা। গল্পের কাহিনিপ্রবাহে একধরনের আকর্ষণ আছে, যা পাঠককে উত্‍ফুল্লচিত্তে এগিয়ে নেয়।
গল্পের চরিত্রগুলো পাঠককে হাসাবে,
কাঁদাবে এবং ভাবাবে।
সবমিলিয়ে গল্পগুলো সুখপাঠ্য। এখানে সাহিত্যের ফুল আছে,
সাহিত্যের কাঁটা নেই!

বইটির প্রথম গল্প ‘দুই মেরুর দুই বাবা’।
হেলাল আর সাথীর দাম্পত্যজীবন। মেয়ে মুনিয়া। মুনিয়াকে অসুস্থ রেখেই বন্ধুর বিয়েতে চলে যায় হেলাল। গভীর রাতে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে মহাবিপদে পড়ে সাথী। হাসপাতালে ভর্তিবিলম্বে মারা যায় মুনিয়া। মুনিয়ার অসুস্থতায় বাবা পাশে না থাকলেও সাথীর বাবা মেয়ের এই দুর্দিনে নির্ভরতার শক্তি জোগায়। এভাবেই দুই প্রজন্মের দুই বাবাকে নিয়ে বাবা দিবসে লেখক গল্পটি লিখেছেন। যা প্রত্যেক বাবাদের বিবেকনাড়ানো বার্তা দেয়!

জিতা প্রখর মেধাবী।
লেখাপড়ায় কখনো পরাজিতা হয়নি। তাই বাবা তাকে ‘অপরাজিতা’ বলে ডাকে। সেই অপরাজিতা একসময় অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিয়ে। কিন্তু বিয়ের পর তার স্বামীর প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়। জিতার উপর শুরু হয় প্রভিন্ন অত্যাচার। কুলিয়ে উঠতে না পেরে একসময় সেই অপরাজিতা আত্মহত্যা করে পরাজিতা হয়। এভাবেই জিতা মেয়েটি পরাজিতা হয় ‘অপরাজিতা’ গল্পে।

‘প্রথা ভাঙার বিয়ে’ গল্পটিতে দুটো বিয়ের
সচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
একটি বিয়ে বর্তমান প্রথা পেরিয়ে আধুনিকতার নামে অশ্লীলতায় আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যায়। পক্ষান্তরে অন্য বিয়েটি প্রচলিত প্রথা ভেঙে দিয়ে সুন্নাতী তরীকায় সাদাসিধেভাবে বিয়েকার্যক্রম সারে। পরবর্তীতে দেখা যায় আধুনিকতার অশ্লীল প্রথায় এগিয়ে যাওয়া বিয়েটির দাম্পত্যজীবনের ভাঙনদৃশ্য। অপরদিকে সুন্নাতী তরীকার বিয়েটির দাম্পত্যজীবনে অপার্থিব তুলির আঁচড়।

এমন ঊনত্রিশটি গল্প নিয়ে ‘বলয় ভাঙার গল্প’ বইটি। প্রতিটি গল্প আমাদের চারপাশ থেকেই নেয়া। প্রতিটি গল্পের শেষে সংযোজিত টিকাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ সবক দেয়। যা আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের অস্থিতিশীল পরিবেশ আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে।

প্রতিক্রিয়া:
চারপাশে সচরাচর যা দেখি, যা শুনি তারই যেন পুনঃপাঠ হলো বইয়ের গল্পগুলো পড়ে। তবে একটু ভিন্ন রঙে, ভিন্ন বর্ণে। কারণ বইয়ের এই গল্পগুলো নিছক বিনোদনের জন্য নয়। এখানে বিনোদন আছে, কিন্তু ‘বেহুদাবিনোদন’ নেই। এই বিনোদন আমাদের অনেককিছু শিক্ষা দেয়। যে শিক্ষায় দীক্ষিত হলে মানুষ আলোকিত হয়, সমাজ হয় আলোকোদ্ভাসিত।

তো বইটি একনাগাড়ে পড়েছি। প্রতিটি গল্প পড়ার সময় একধরনের ভালো লাগা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। টিকাগুলো পড়ে অনেক কিছুই জানতে পারলাম। সমাজের কুপ্রথা, কুসংস্কার, অপসংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক জানতে এবং তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে অবগত হলে বইটি পড়া খুবই ফলপ্রসূ হবে বলে আমি মনে করি। সেইসঙ্গে লেখককে অভিনন্দন জানাই বাংলাভাষার পাঠকদের এমন একটি মহার্ঘগ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য।

 

মাই নিউজ/মাহদী

৫০৬ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   আরব আমিরাতে আজমানে আগামীকাল হতে সিনেমা, জিম, সেলুন ও যা যা খোলা হবে !   ❖   রাস্তার ছেলে   ❖   সাধারণ রোগীরা কি চিকিৎসা পাচ্ছে?   ❖   বাজেট দিয়ে কী হবে?   ❖   তুরষ্ক পাঠ্যবইয়ে জিহাদ ঢুকিয়েছে, বের করেছে বিবর্তনবাদ   ❖   আরব আমিরাতের করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় ভাইস প্রেসিডেন্টের অনলাইন বৈঠক !   ❖   চার্জ ফ্রি রেমিট্যান্স প্রেরণ সুবিধা চালু করল ব্যাংক এশিয়া   ❖   তিনি কত দয়ালু এবং ক্ষমাশীল   ❖   খিদমাহ ফাউন্ডেশনের চান্দিনায় ইফতার ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ   ❖   সম্পত্তির লোভে বাবাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত