All for Joomla The Word of Web Design
গল্প

আমার বউ

আহমেদ আববাস

একদিন অফিস থেকে বাসায় এসে দেখি- স্ত্রীর ভেতর নিয়মিত অভ্যর্থনা ঔৎসুক্য নেই। দৃষ্টিতে যেন ঘৃতভস্ম। অনিন্দ্য সুন্দর মুখশ্রীর ওপর ঘন মেঘের ঘনঘটা। বিষাদের বিষণ্নতায় বেঘোর দশা। মুখে হাসির বদলে কে যেন বদনে কয়েক মন কালি লেপন করে দিয়েছে। ভাবলাম, তার মন ভালো নেই। মন ভালো থাকেই বা কী করে। সে সময় খুলনায় বাসা, মংলায় চাকরি। উদয়াস্ত অফিস। মাঝে মধ্যেই চোরাচালান নিরোধে সমুদ্রযাত্রা, হরতাল, বাস ধর্মঘট, সীমান্ত চৌকিতে রাতযাপন- সব মিলিয়ে মাসে এক দিনও সূর্যের আলোয় স্ত্রী-সন্তানের মুখদর্শন হয় না। স্ত্রীর অপ্রসন্ন মেঘাচ্ছন্ন মুখচ্ছবি দেখে এ রকম নানা বিক্ষিপ্ত চিন্তায় হারিয়ে যাচ্ছি। আর ঠিক সে মুহূর্তেই গিন্নি গোখরো সাপের মতো ফোঁস করে ওঠে- ‘বাসায় না আসলেই তো তোমার ভালো হয়, মজা করে হাফিজ ভাবীর হাতের রান্না খেতে পার। তার হাতের রান্না খুব মজা না! আমি কী রান্না করতে পারি না।’

এক বাস ধর্মঘট দিবসে কর্মস্থলে রাতযাপনের উদ্দেশ্যে মংলায় রয়ে যাই। দেশের নানা অস্থির সময়ে মাঝে মাঝেই কর্মস্থলে রাতযাপন করতে হয়। নিশিবিরতির অবকাশে সহকর্মীর অনুরোধে তার বাসায় গেলে সান্ধ্যভোজনের অনুনয় উপেক্ষা করতে পারিনি। প্রাচীরেরও যে শ্রবণশক্তি আছে, সেটা বাসায় এলে টের পাই। বিষয়টি সম্পর্কে অনেক সাতপাঁচ বলে- হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায় গৃহিণীকে কোনোমতে স্নিগ্ধ করার চেষ্টা করি, তাতে কিছুটা প্রণয় মেলে। অর্থাৎ ‘তৈলে মনও ফেরে।’
প্রিয়তমার ঝাঁজ নিবারণের পরদিন বিরলভাবে সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করার সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর সেদিনই সকালবেলা বিনা নোটিশে যশোর থেকে গৃহলক্ষ্মীর দুই খালার দুই মেয়ে এসে অস্তিত্বশীল হয়। দু’জনেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা ভার্সিটির পাঠার্থী। কানন আর কুমি। আমার সামনেই স্ত্রীকে কানন বলতে থাকেÑ আপু, এবার দু’জনেরই পনের দিন ছুটি। তোমাদের এখানে সাত দিন থাকব। কুমি তাতে সুর মেলাল।

‘ঠিক আছে।’ এ কথাটি আমি বলতে বলতেই স্ত্রী বলে, ‘এ-ই ছেমড়ি তোদের পড়াশুনা নেই; শুধু ঘুরে বেড়ালেই চলবে!’
‘না আপা, এখন আমাদের পনেরো দিন ছুটি তো, তাই।’ কুমকুম আত্মপক্ষ সমর্থন করে।

জোটে গরহাজির থাকলেও আমার সমর্থনে ইতোমধ্যে স্ত্রী তার দুই কাজিনকে নিয়ে জাহানাবাদ বনবিলাস চিড়িয়াখানা, জোড়াগেট প্রেমকানন প্রমোদ-উদ্যান এমনকি বাগেরহাট খানজাহান আলীর মাজার পর্যন্ত বেড়ানো শেষ করেছে।
এবার অনিবার্যভাবে আসে আমার পালা। যেখানে আমার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। বিশ্বের বৃহদায়তন শ্বাসমূল বনাঞ্চল সুন্দরবন পরিদর্শনে আমার সান্নিধ্য সহযোগিতা অপরিহার্য। আমি না থাকলে কে ওদের স্পিডবোট দেবে, কে ওদের ভ্রমণে পথপ্রদর্শন করবে। আগেই ওদের আবদার ছিল, ‘দুলাভাই, সুন্দরবন ভ্রমণে আপনাকে সাথে থাকতে হবে।’

তখন আমি সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে ডেপুটেশনে নিয়োজিত ছিলাম। মংলা অঞ্চলে খবরদারি করার জন্য সেখানে একটা ফৌজিছাউনি রয়েছে। উপকূলীয় রাষ্ট্রীয় সীমান্ত রক্ষার জন্য রয়েছে বেশ কিছু স্পিডবোট। আর ট্রুপক্যাম্পটি দেখভালের বাড়তি দায়িত্ব ছিল আমার কাঁধের ওপর। এ জন্যই শ্যালিকাদের সুন্দরবন দেখার জন্য আমাকে আবশ্যক।
শুক্র-শনিবার ছুটির দিনেও অফিস থেকে ছুটি নিলাম। যাতে কোনো জরুরি কাজেও আমাকে না ডাকে। খুলনা থেকে মংলা যাওয়ার বাহন হিসেবে জিপের পরিবর্তে মাইক্রোবাস অ্যামিনিটি নিয়েছি। যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করা যায়।

ড্রাইভারের পেছনে তিন সিটের আসনে আমার স্ত্রী এবং আমাদের সাত বছরের সন্তান আর মেজোখালার মেয়ে কানন। পরের আসনে আমি ও ছোটখালার মেয়ে কুমি। আমার স্ত্রী পরেছে আকাশি রঙের ওপর হাতের কাজ করা কামিজ-সালোয়ার। কানন পরেছে জাঁকাল লেহাঙ্গা, হাতে মানানসই ব্রেসলেট। আমার নিকটতম সহগামী কুমি পরেছে টাইট জিন্স ও যশোর স্টিচের পাঞ্জাবি।

রূপসা ব্রিজ পার হয়ে মাইক্রোবাসটি ছুটে চলে নিরবচ্ছিন্ন গতিতে। মাঠঘাট পেরিয়ে দিগন্ত অভিমুখে। সুন্দর ও প্রশস্ত রাস্তা, কোথাও চূর্ণ-বিদীর্ণ কিংবা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন নেই- নিখাদ রাজপথ। পথ চলতে রাস্তার দু’পাশে যা কিছু দেখে, ‘দুলাভাই এটা কী, ওটা কী।’ এভাবে-সেভাবে নানান জিজ্ঞাসা। আমি যে কুমির সাথে কথা বলছি, এটা আবার আমার স্ত্রী মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে আর বলে- ‘এই কুমি, এত কিসের কথারে। সব তো চোখেই দেখা যাচ্ছে। তিনজনের সিটে তোরা দু’জন বসেও তো তুই তোর দুলাভাইয়ের গায়ের ওপর উঠে বসেছিস। আলাদা হয়ে বোস।’
‘না, আপু এখানে নাকি খুলনা এয়ারপোর্ট হবে, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।’

খুলনা শহর থেকে মাত্র এক ঘণ্টায় আমরা মংলার দিগরাজ ঘাটে পৌঁছে যাই। সুন্দরবন দেখতে যাবো বলে আগ থেকেই একটা সিঙ্গেল স্পিডবোট রেডি করা ছিল। একজন ইঞ্জিন ড্রাইভার নিয়ে আমরা সুন্দরবন দেখার উদ্দেশে স্পিডবোটে চড়ে বসলাম। পূর্ব-অভিজ্ঞতার কারণে আমি নিজেই স্পিডবোট স্টিয়ারিং করছি। কানন কুমি দুইবোন আমার দু’পাশে। প্রথম স্পিডবোট ভ্রমণের আতিশয্যে দু’জন রোমাঞ্চিত হয়ে আমার কাঁধ ঘেঁষে আসে। অদূরে শিশুকে নিয়ে স্ত্রী ফুঁসতে থাকে। একসময় কাজের মেয়ের কাছে শিশুকে রেখে আমার নিকটবর্তী হয়।

উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত পশুর নদী। আমরা দক্ষিণে যাচ্ছি, কিছুটা ডান পাশ ঘেঁষে। লোকালয়হীন নদীর পাড়ে বাঁশের বেড়ার গোলপাতা ছাউনির বেশ কিছু খুপরিঘর। সেখানে অনেক মেয়ে জটলাবদ্ধ এবং এলোপাতাড়িভাবে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে দু-একজন সাদা চামড়ার দামড়াকে দেখে কানন কুমি জিজ্ঞেস করে, ‘দুলাভাই ওখানে কী?’
‘ব্রোথেল।’ আমার প্রত্যুত্তরে ওরা নিশ্চুপ হয়ে যায়।

স্পিডবোট সামনে এগোতে থাকে। ডানপাশ থেকে শুরু হয় বিস্তীর্ণ সুন্দরবন। শ্বাসমূল বা গরান জাতীয় বৃক্ষের এক অবারিত অভয়ারণ্য। চোখ ধাঁধানো সবুজের সমারোহ। অল্প দূরত্ব অতিক্রম করলেই চোখে পড়ে করমজল ফরেস্ট অফিস। দর্শনার্থীদের জন্য পরিপাটি করে সাজানো বন বিভাগের এই টহলচৌকি। আমাদের স্পিডবোট সামনে অগ্রসর হতে থাকে। গমনপথে জায়া এবং তার ভগ্নিগণ এক সময় বিযুক্ত হয়ে যায়। হারবাড়িয়া অতিক্রম শেষে আবার মনকাড়া দু’জন এসে স্টিয়ারিং ধরার জন্য কাড়াকাড়ি আরম্ভ করে। উৎফুল্ল হয়ে দু’জন স্টিয়ারিং ধরতে আমার হাতের ওপর হাত রাখে, গায়ে গা লাগে। কুমি একটু ছোট বলে আমার সাথে বেশি একাকার হয়ে যায়। স্ত্রী দেখে মনে মনে জ্বলতে থাকে। এভাবে আমরা সুন্দরিকোটা পর্যন্ত যাই। যেখানে পশুর নদীর দু’পাশে ঘন নিবিড় সুন্দরিগাছ। নিঃসীম নীলিমায় মিশে দিগন্তের সমান্তরাল হয়ে গেছে।

মংলা সুন্দরবন বেড়িয়ে বাসায় আসার পর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে শুরু হয়, কুরুক্ষেত্রের লড়াই। অপেক্ষাকৃত কম ধ্বনিতে চলতে থাকে বাদানুবাদ, কলহ, কোন্দল ও মতবিরোধ। দু-একটা কথা বলার পর আমি মুখে কুলুপ লাগিয়ে নীরব, নির্বাক ও শব্দহীন হয়ে যাই। মৌনির কোনো প্রতিপক্ষ নেই, এই তত্ত্ব আমি অবল¤¦ন করি। এতে ধীরে ধীরে কাজও হয়। তবুও রাগে গরগর করে বলতে থাকে, ‘আমি কী বুড়িয়ে গেছি। আজ মাত্র দশ বছর বিয়ে হয়েছে। তোমার বয়সও তো ত্রিশ পার হয়ে গেল। ছোটলোক, ইতর, ছেলেদের বিশ্বাস নেই। শালী দেখে বউ ভুল হয়ে যায়।’

যা মুখে আসে তা-ই বলে নিবৃত্ত হতে থাকে। আমি চুপ থেকে অতি যথাকর্তব্য দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দিই। ব্যক্তস্বর উচ্চকিত হলেই গোপিনিরা জেগে যেতে পারে। ভীতি ও সঙ্কোচ কাটিয়ে সংশয়চিত্তে অনুচ্চস্বরে বলি, ‘কবিরা তো শ্যালিকার গুণগান করে গেছে। কবি গোলাম মোস্তফা কী বলেছে, জানো? তিনি বলেছেন, ‘এতদিন পরে আজ বুঝেছি মনে, বধূ সে মধুর নয় শালী বিহনে।’ শোনার পর প্রচ্ছন্ন যন্ত্রণা আবার জাগ্রত হয়। শ্যালিকা প্রসঙ্গ টানার জন্য কুপিত ক্রোধ প্রশমনে দুঃখ প্রকাশ করে অনুনয় করি। শেষে আপসে সন্ধি করি। সমঝোতা অবসানে নির্ভার হয়ে দু’জন শুয়ে পড়ি। কারো অন্তর্বেদনা যাতে নির্বিঘœ ও শান্তিপূর্ণ নিদ্রায় অন্তরায় হয়।

কানন-কুমি যশোর প্রত্যাবর্তনের পর সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় এসে দেখি- স্ত্রীর মন অনেকটা প্রসন্ন, প্রফুল্ল এবং খোশমেজাজি। তার মনোভাব বুঝে একটু আদর করে অনুগত হয়ে স্ত্রীকে বললাম, ‘তুমি সেদিন অমন করছিলে কেন, ওরা কি আমার সাথে কোনো অশোভন আচরণ করেছিল?’ ’ওসব কিছু জানি না, কিছু বুঝি না। তোমার সাথে অন্য কোনো মেয়েমানুষ দেখলেই আমার মনে হয় ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে যেদিকে মন বলে, সেদিকে চলে যাই।’
‘তুমি যদি পঙ্গু অপারগ হয়ে যাও।’ রাগানোর জন্য বলি।

‘যখন জানব যে আমি তোমার জন্য অযোগ্য হয়ে গেছি, তখন নিজের মরার পথ তৈরি করে কৌশলে তোমাকে মেরে ফেলব এবং নিজেও মরব। তোমাকে ছেড়ে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে চাই না। তুমি আমার। শুধু আমারই। তোমার জন্যই শুধু এ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি। তোমার হয়েই শুধু এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই।’

১৬৪ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   কাল থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে আরব আমিরাতের মসজিদ   ❖   এডিআইও আবুধাবিতে স্টার্টআপের তহবিলের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর জন্য শোরুক পার্টনার্স বেদায়া তহবিলে বিনিয়োগ করেছে   ❖   বাইতুল মোকাররমের খতিব হতে পারেন মাওলানা হাসান জামিল সাহেব!   ❖   ভারতীয় একজন কিডনী ব্যর্থতায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, তুমি নিরাপদ হাতে রয়েছ   ❖   উচ্চ আদালতের স্থিতিবস্থা জারির পরও ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে রাজধানীর একটি মসজিদ   ❖   করোনাকালে ক্বওমী মাদরাসাগুলোর ১২ চ্যালেঞ্জ   ❖   চাকরিচ্যুৎ সেই ইমামকে স্বপদে বহাল করতে লিগ্যাল নোটিস   ❖   আজারবাইজানকে ১১ টন চিকিত্সা সহায়তা পাঠিয়েছে আমিরাত   ❖   রাতে নৌকার ছাদে জানাজা পড়ে লাশ ফেলা হতো সাগরে : খোদেজা বেগমের দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রা   ❖   স্বেচ্ছাচার, স্বজনপ্রীতি ও স্বৈরাচার