All for Joomla The Word of Web Design
প্রবাস জীবন

মাহে রমজানের সেইসব দিনগুলো

 খান মুফতি মাহমুদ
মাই নিউজ, ‘ফ্রান্স প্রতিনিধি’।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভ বা খুঁটির মধ্যে ‘মাহে রমজান’ একটি। যাকে ফরজ বলা হয়। ধর্মের বিধানমতে নাবালক ও অসুস্থ ব্যক্তি ব্যতিরেকে সাওম বা রোজা পালন করা সকল মুসলমান নর-নারীর জন্য বাধ্যতামূলক। পবিত্র কোরআনুল কারিম, হাদীসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হক্কানি আলেমগণের বর্ণনায় রমজানের পূর্বাপর আমরা জানতে পারি ।

খুউব মনে পড়ে ছোটবেলায় মাহে রমজান উপলক্ষে প্রস্ততির কথা। শুক্রবার জুম’আর নামাজে খুতবা জানান দিত রমজানের আগমনী শুভবার্তা। রোজাপূর্ব কয়েক জুম’আর খুতবায় ইমাম সাহেবদের রমজানের ফজিলত বর্ণনায় সকলেই উৎসাহিত হতো। এগারো মাস খেয়ে-পুরে শক্তি সঞ্চয় শেষে মাত্র একমাস একমাত্র স্রষ্টার তরে বিলিয়ে দিয়ে পূর্ববর্তী পাপকালিমা ধুয়ে মুছে পরিছন্ন হওয়ার মাস রমজান সমাদৃত।

অপরদিকে মক্তব থেকেও শিখতে হতো— রমজান কী, কখন থেকে রোজা রাখার বিধান, রোজা রাখার বয়স, তারাবি নামাজ, সেহরি ও ইফতার। রমজান শুরুর পনের দিন আগে থেকে গুণতাম— আর কতদিন বাকি পবিত্র রমজানের!

চাঁদ দেখার বিষয়টা ছিল খুবই রোমাঞ্চকর। বাল্যবন্ধুদের সাথে প্রতিযোগিতা ছিল— কে সর্বপ্রথম চাঁদ দেখল। আকাশ মেঘাছন্ন থাকলে আমাদের চেহারাতেও মেঘের আভাস ফুটে ওঠত। পরিছন্ন আকাশ হলে, আমাদের মুখে ভাসত হাসির ছোঁয়া।

মসজিদ থেকে চাঁদ দেখার ঘোষণার জন্য অপেক্ষার প্রহর ছিল কঠিন। মেঘলা আকাশেই ঘটত বিপত্তি। সরকারি ঘোষণা শোনার জন্য রেডিওতে কান পেতে থাকতে হতো। ছোটবেলায় দেখতাম, সবার ঘরে রেডিও ছিল না; টেলিভিশন-এর কথা তো বলাই বাহুল্য। তাছাড়া তখনও গ্রামের মসজিদগুলোতে আজানের জন্য মাইকের ব্যবস্থা ছিল না। এহেন পরিস্থিতিতে এশার নামাজের ওয়াক্তে তারাবি শুরু হবে কি না— মাধ্যমেই রমজান মাস শুরু করা হতো।

পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যে ছিল আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা। অপরদিকে মসজিদ মক্তবও ছিল বাড়ির খুব কাছে। ইচ্ছা করলেও ফাঁকি দেওয়ার পথ ছিল না। যতটুকু মনে পড়ে, সেই বাল্যবেলা থেকেই সেহেরি খাওয়া দিয়ে রোজা শুরু আমার। দিনভর খোঁজা হতো বন্ধুদের মাঝে কে কে রোজা রেখেছে আর কে রাখেনি। অবুঝ মনেই রোজাদার হিসাবে নিজেকে গর্বিত মনে হতো। রোজা রাখার বিষয়টি প্রতিবেশীসহ সবার মাঝে জানাতে পারাটা যেন আনন্দের ছিল। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুধার্ত হলেও কোনোভাবেই যেন কিছু না খেয়ে ফেলি— সেদিকে ছিল সর্বোচ্চ সতর্কতা।

মনে পরে, রোজায় কাতর হয়ে অবস্থার বেগতিক দেখে মা বলতেন, ছোটদের দিনে দুইটা রোজা হয়! ইচ্ছা করলে, খেতেও পারো! আরেকটু বড় হলে, একটা করে রোজা রাখতে হবে। মায়ের কথা শুনতাম না। বড়দের মতো করে আমাকে রোজা রাখতেই হবে— বায়না ধরে বসে থাকতাম। তাছাড়া বন্ধুরা যদি আমার চেয়ে বেশি রোজা রাখে— তাই প্রতিযোগিতা করতে করতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ রোজা ফরজ বা বাধ্যতামূলক।

ইফতার সামনে নিয়ে বসে অপেক্ষা ছিল খুবই আনন্দের, আহা! যে অনুভূতি বলে বুঝানো সম্ভব নয়। মায়ের হাতে বানানো বাহারি সুস্বাদু কতসব ইফতারের খাবার। যা স্মরণে আজও জিভে জল আসে। মাকে দেখতাম, সুবিধাবঞ্চিতদের ডেকে এনে ইফতার করাতেন, রাতের খাবার খাওয়াতেন। শুধু তাই নয়; সেহরির খাবারও সাথে করে দিয়ে দিতেন।

এছাড়াও ইফতার তৈরি করে প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতেন। প্রতিবেশীরাও একই কাজ করতেন। আত্মীয়দের দাওয়াত করে ইফতার করানো ছিল খুবই আনন্দদায়ক। যা অধিক সওয়াবেরও বিষয়।

আরেকটা বিষয় ছিল অনেকটা বাধ্যতামূলক। তা হলো, রমজানে মসজিদের ইমাম সাহেব বা মক্তবের হুজুরকে গ্রামবাসী মিলে খাওয়ানো। এরও একটা প্রতিযোগিতা ছিল। এমনও দেখা যেত, রমজানের ত্রিশ দিনে হুজুরকে খাওয়ানোর জন্য দিন বরাদ্ধ পাচ্ছেন না। তাই মুরুব্বিরা মিলে ভাগ করে দিতেন, কেউ ইফতার ও সন্ধ্যার খাবার দিবেন, কেউবা সেহরির খাবার। আমাদের পরিবারসহ অন্যরা কেউই রমজানে কাউকে ইফতার, সেহরি খাওয়ানোর ফজিলত থেকে বঞ্চিত হতে চাইতেন না। বিষয়টা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও আনন্দের।

রমজান মাসে বাড়ি বাড়ি পবিত্র কোরআন খতম করা ছিল উল্লেখ করার মতো। যেহেতু রমজান মাসেই মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। তাই পবিত্র কোরআন পড়া ও খতম করার সওয়াব অধিক অর্থাৎ সত্তর গুণ বিধায় তরুণ-যুবক এমনকি ঘরে ঘরে একটা প্রতিযোগিতা হতো। লাইলাতুল কদরের রাতে মসজিদগুলোতে দোয়ার জন্য ঘোষণা আসত, কোন ঘরে কতবার পবিত্র কোরআন খতম করা হয়েছে।

এখনকারমতো তখন মাইকে সেহরিতে ডাকার ব্যবস্থা না থাকাতে টেবিল ঘড়ির অ্যালার্মে ঘুম ভাঙত আমাদের। প্রতিবেশীদের ডেকে উঠাতাম। যা এখন শুধুই অতীত।

ছোটবেলাতেই মক্তবের হুজুর শিখিয়েছেন রোজা রাখা অবস্থায় করণীয় ও বর্জনীয়। রমজানের ত্রিশ দিনকে ভাগ করা হয়েছে তিনটি স্তরের ফজিলত দিয়ে। যেমন, প্রথম দশদিন রহমত, দ্বিতীয় দশদিন মাগফেরাত এবং সর্বশেষ দশদিন নাজাত বা জাহান্নাম থেকে মুক্তি— অর্থাৎ সঠিক ইবাদতের মাধ্যমে যা অর্জন করা সম্ভব।

রমজান মাসে ফরজ ইবাদতের সওয়াব সত্তর গুণ এবং যে কোনো নফল ইবাদত (নফল নামাজ, কোরআন পাঠ, তাসবিহ, দান-ছদকা) যা বাধ্যতামূলক নয়, সেসবের ফজিলতও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একইভাবে অর্থাৎ সত্তর গুণ বেশি নেকি দান করবেন। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ রমজান মাসে মসজিদে বসে বেশি বেশি ইবাদত করে নেকি হাসিলের আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

রমজান মাসকে বলা বলা হয় ‘সংযমের মাস’। সকল প্রকার পানাহার, পাপকাজ  থেকে নিজেকে ও অন্যদেরকে বিরত রাখাই উত্তম কাজ। এ মাসকে ‘পবিত্র কোরআনের মাস’ও বলা হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআন অবতীর্ণের এ বরকতময় মাসের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতকে আল্লাহ অধিকতর মহিমান্বিত রজনী করে রেখেছেন। যাকে ‘লাইলাতুল কদর’-এর রাত বলা হয়। যে রাতের ইবাদত হাজারো রাতের ইবাদতের সমান বলা হয় বলে আলেমগণ বিশ্লেষণ করেছেন।

সেই ছোটবেলায় ‘লাইলাতুল কদর’-এর রাতের সন্ধানে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, উনত্রিশ রাতগুলোতে মসজিদের নফল ইবাদত (পবিত্র কোরআন পাঠ, নফল নামাজ, তাসবিহ-তাহলিল) কোনোভাবেই ভুলবার নয়।

রোজা পালন বাধ্যতামূলক ও মুত্তাকি হওয়ার সুযোগ থাকলেও বাল্যবেলায় রোজার ক্লান্তিও ছিল রোজা কবে শেষ হবে— সে প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করা। কিন্তু আল্লাহ পাক রমজান পালন শেষে সকলের জন্য রেখেছেন এক মহা আনন্দের দিন ‘ঈদ’। যা উদযাপনের প্রস্তুতিতেও কেটে যেত রোজা রাখার সব ক্লান্তি। যেমন, নতুন জামা ক্রয়ের ব্যস্ততা ও প্রতিবেশী বন্ধুদের মাঝে ঈদ-পোশাকের গুণগান করা।

তাছাড়াও মা’কে দেখতাম সাধ্য অনুযায়ী সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে জামা-কাপড় বিতরণ করতে। ঈদের নামাজের পূর্বেই তাদের মাঝে ‘ছদকায়ে ফিতর’ পৌঁছিয়ে দিতে। জাকাত হিসাবে পাওনাদার অসহায়দের ডেকে তা বুঝিয়ে দিতে। সব কিছুই হতো মহান আল্লাহর জন্য, তাঁরই সন্তুষ্টির আশায়।

সকাল গড়িয়ে যেমনি সন্ধ্যা… বাল্যবেলা পেড়িয়ে তেমনি যৌবন। সবকিছুই স্রষ্টার হুকুমের দাস। আর এই আমি এখন গর্ভধারিণী মা ও আমার প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে প্রবাসে।

মহান আল্লাহর দেওয়া বিধানগুলো অপরিবর্তিত থাকলেও কালের পরিবর্তনে বদল হয়েছে আমাদের মন, মানুসিকতা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা যান্ত্রিক সভ্যতা পেয়েছি। আমরা হয়েছি ‘রোবট’।

পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন থেকে বহুদূরে বসবাস করে প্রতি রমজানেরই স্মৃতির অ্যালবাম উলটাতে থাকি। সেহরি, ইফতার, তারাবি সবই চলে ধর্মীয় রীতিতে কিন্তু কোথায় যেন শূন্যতা অনুভব করি। প্রবাসের ব্যস্ততায় ঘড়ির কাটা ঘুরতে থাকে বিদ্যুৎ গতিতে। তবে খানিক ফুরসতে ভাবনায় চলে যাই মাহে রমজানের সেইসব দিনগুলোতে।…

*লেখকের ই-মেইল:
[email protected]

মাই নিউজ/মাহদী

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখল বেআইনি: বাংলাদেশ   ❖   ২৬ ছাত্রকে বুয়েট থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার   ❖   ইডেনে কমান্ডো ঘেরা বক্সে বসবেন প্রধানমন্ত্রী   ❖   কাশ্মীরে গণধর্ষণের ডাক ভারতীয় উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার!   ❖   হংকংয়ে ২০০ অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলতে পারে পুলিশ   ❖   সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রিতে ১০ এমবিপিএস হারে ওয়াইফাই দেবে সরকার   ❖   এবার চালের দাম বাড়ানোর ষড়যন্ত্র চলছে   ❖   সাবেক মন্ত্রী খ. মোশাররফের এপিএসের ৭ বছরের কারাদণ্ড   ❖   আমার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালালে অনেক এমপি-মন্ত্রীর যাবজ্জীবন হবে: নাজমুল   ❖   বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ডা. আরিফের এবার যুক্তরাষ্ট্র জয়