All for Joomla The Word of Web Design
উপন্যাস

মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস

ফ্লেউর ডে লিস (পর্ব : ১)

— মাসউদ আহমাদ
(তরুণ লেখক)


মিলান…! মাহদী নিজের পুরো নামটা মনে করতে পারল না। মাহদী তাদের বাড়ির বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। মাহদীকে ছেড়ে সেই ছেলেটা ছুটল মিলানের ফিরে আসার ঘোষণা করতে। বাগানের ভেতর ঢুকে মাহদী কাছেই কোথাও কারও উপস্থিতি অনুভব করল। সারি সারি গাছের ছায়ায় ছায়ায় কিছুটা এগিয়ে গিয়েই দেখতে পেল ছোটো বোনকে। ‘আদ্রিয়া ভিনা!’ অস্ফুটস্বরে নামটি উচ্চারণ করে ফেলল মাহদী। ছবি আঁকছিল এতক্ষণ, ফিরে তাকাল মাহদীর দিকে। চোখে মুখে ফুটে উঠতে থাকল অবিশ্বাসের চিহ্ন। হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল মাহদীকে, ‘ভাই!

আওয়াজ মানুষের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? একদিন তো আওয়াজেই সবকিছু ধ্বংস হবে৷ আওয়াজ দিয়েই যেমন সৃষ্টি করা হয়েছিল। আওয়াজ মিটিয়ে দিতে পারে, আওয়াজ এনে দিতে পারে সুখকর অনুভূতি।’ মাহদী এই আওয়াজ, এই মোলায়েম কণ্ঠ পাঁচ বছর আগে শুনেছিল। ধীরপায়ে মাহদীর দিকে এগিয়ে এলো আদ্রিয়া ভিনা। ‘কে ও?’ আদ্রিয়ার পেছনে মায়ের আওয়াজ শুনতে পেল মাহদী। তিনিও এগিয়ে আসছেন। দ্রুতপায়ে। মাহদী ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।

অনেকদিন পর… আজ অনেকদিন পর৷
‘মিলান! আমার বাবা মিলান!’ শেষে দৌড়ে এলেন মাহদীর আম্মু। আদ্রিয়া তার ভাইকে ছুঁয়ে দেখছে৷ আম্মু এসে মাহদীকে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁদতে লাগলেন তিনি। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য আর ভালোলাগা মেশানো মা, মাহদী ভাবছে—জীবন যদি অনেক দীর্ঘ হতো! মাহদী তার আম্মুকে তখনই সবকিছু খুলে বলতে লাগল। কীভাবে, কী হলো, এতদিন কোথায় কেমন বন্দিজীবন সে কাটাল।… ভয়ংকর স্বপ্নের মতো সেই জগতকে ধ্বংস করে দিয়েছে মাহদী। কিন্তু ফ্লেউর ডে লিস! ‘আমাকে আজ কেউ কিছু করতে পারবে না। কেননা, প্রকৃতির হিমেল এখন আমার কাছে।’ একদিন সত্যিই স্বপ্নে দেখা তার এই ঘোষণা দেওয়ার কথা মনে পড়ল। কতদিন মাহদী ভেবেছে, প্রকৃতির হিমেল আসলে কী। মাহদী এখন জানে, আসলে সেটি কী। সূত্র। প্রকৃতির সূত্র। শূন্যতা থেকে সবকিছু এবং সবকিছু থেকে শূন্যতা বানানোর সূত্র। শূন্যতা ও সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার সূত্রই প্রকৃতির হিমেল কথাটির ইঙ্গিত। এর সাথে ফ্লেউর ডে লিস–এই প্রতীকের কী সম্পর্ক সেটাই এখনো তার বোধগম্য নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের গভীরতা হলো রহস্যময় ভিনজগতের মতো। সব সমস্যারই সমাধান করা সম্ভব৷ কোন প্রবাল দ্বীপের চারপাশে ঝিনুকে মুক্তার সমাহার, তা অভিযানেই দেখা যাবে। কেউ বলেছেন, ‘ফ্লেউর ডে লিস’ শয়তানের প্রতীক। কোনো প্রতীক কীভাবে শয়তানের হয়? উমম, আমার যুক্তিতে কিছু ধরছে না বলেই যে তা অযৌক্তিক হবে এমন কিছু ভাবার মানে নেই। সামান্য প্রতীকের জন্যও অনেক রক্ত ঝরেছে পৃথিবীতে। প্রতীকের মর্যাদা যাদের কাছে যা তারা বোঝে অন্যেরা কেমন অজ্ঞতায় ডুবে আছে৷ আমাদের শান্তির ধর্ম ইসলামের সাথে কোনো প্রকার প্রতীকের সম্পর্ক আছে?

প্রথম দিনটি কাটল। এটি ছিল মিলানের জীবনের সেরা দিন। সারাদিন কেউ তাকে দেখে কেঁদে ফেলেছে, কেউ মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তার সাথে ঘুরতে থাকা বন্ধুরা বিশ্বাসই করতে চায়নি, মিলানের সাথেই তারা রয়েছে। মিলানের আব্বু যখন মিলানের কথা শুনে ছুটে এসেছিল, মিলানকে বুকে জড়িয়ে ধরে নীরব হয়ে ছিল—সেটি ছিল মিলানের জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত।
সেরা মুহূর্ত ও সেরা দিনগুলো সহজেই হারিয়ে যায়। মিলানের জীবন আবার সংগ্রামমুখর হয়ে ওঠল।

‘ফ্লেউর ডে লিস’ ক্লাবে জয়েন করল মিলান। প্রতিদিন ক্লাবের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে থাকল। মিলান অনুভব করতে থাকল, প্রতিদিন চারপাশে এমন কতকিছু ঘটে যাচ্ছে, মানুষ যেগুলোকে সাধারণ ভেবে ফেলে যাচ্ছে। মিলান নিজেকে নিয়ে ভাবতে থাকল, কতকিছুই-না তার অজানা ছিল। হাভানার ফ্লেউর ডে লিস ক্লাবের ছোট্ট পরিবারটি ছিল মিলানের আব্বুর তৈরি করা। মিলান সেই ছোট্ট থেকে ফ্লেউর ডে লিসের কার্যক্রম দেখে এসেছে। কিন্তু অল্পবয়সে ক্লাবের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ যেহেতু ছিল না, তাই মিলানকে কিছুটা দূরে দূরেই থাকতে হয়েছে। তার আব্বুকে দেখে মিলানের মনে হয়েছিল, মিলানের অতীত হওয়া দুর্ঘটনার দায়ে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। মিলান ভাবছে, তার আব্বুকে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি মনপ্রাণ দিয়ে ফ্লেউর ডে লিসের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ভাবছেন, তার জীবনই এই ক্লাবের প্রতিষ্ঠার জন্য। কত বছর আগে মিলান তার আব্বুর মুখে শুনেছিল ‘বিদায়’? মিলানের মনে পড়ে, মাত্র পাঁচ বছর আগে৷ কিন্তু সেই পাঁচটি বছর পঁচিশ বছরের সমতুল্য। মিলান বা তার আব্বু কখনো ভাবেনি, ফ্লেউর ডে লিস এমনকি তাদের পরিবারের ওপরেও কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। ছোট ছোট বালক-বালিকা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মানুষেরা ক্লাবের সাথে এখন যুক্ত রয়েছে। মিলানের আব্বুর ত্যাগের ফলাফল। সর্বশেষ সাত বছর আগে মিলান হাবার হিলডা রাবিলেরোকে দেখেছিল। আজ মিলানের সামনে সে বসে আছে। ‘আব্বু মনে করেন, তিনি আমাকে একটি মহৎ কাজে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি সত্যই ভালো কিছু করেছিলেন। ‘কিন্তু আমি তাতে ভালো করিনি। আমি তোমাকে উৎসাহ দিয়ে ভালো করিনি।’

মিলান চেয়ার ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
বৃষ্টি হয়েছে। সকালটাকে বেশি চকচকে লাগছে আজ। পূব দিগন্তে সূর্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মিলান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল সেখানে। ভাবছে মিলান৷ হিলডা… সে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছে? হিলডাকে পছন্দ করে না মিলান। সে টেবিলে গিয়ে বসতে না বসতে হিলডা এসেছিল। দোতলা ভবন ফ্লেউর ডে লিস ক্লাবের। বিরাট এলাকাজুড়ে ভবনটি। প্রতিদিন সকাল হতে হতেই মুখরিত হয়ে যাচ্ছে। কিশোর বয়সী যারা রয়েছে তারা সাধারণত ভোর চারটার আগেই এখানে এসে যাচ্ছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সূর্য ওঠার সময় এসে যায়। সকাল আটটা পর্যন্ত জায়গাটি মুখর, তারপর সারাদিন বাদে, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত এগারোটা। শিশু ও তাদের অভিভাবকেরা অবশ্য নয়টার মধ্যেই বিদায় হয়। মিলান একটা বিষয় মেলাতে পারছে না। সে যা কিছু এই কিছুক্ষণ আগেই বলেছে, তার মন কেন মেনে নিতে পারছে না! সে কেন যা বলছে তা তার মনের অনুভূতি হচ্ছে না!
মাহদির জীবনের কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না মিলান। ডায়েরিটা এক ডায়েরিমাত্র ছিল না। সেটি একটি জীবন ছিল। মাহদীর জীবন। মাহদীর কথা ভাবতেই বিষণ্ণ হয়ে যাচ্ছে মিলান। কীভাবে এমন একটি ডায়েরি তৈরি করা হয়েছিল? মাহদী যদি বাস্তবের কেউ না-ই হয়ে থাকে… মিলান জানে না, তার ওপরই প্রথম এ ডায়েরি দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করা হয়েছে কি না।

পায়চারি করছে মিলান। তার মন বিক্ষিপ্ত। মানুষের মন কীভাবে বিক্ষিপ্ত হয় তা মিলান ভালোমতোই উপলব্ধি করতে পারছে। সে না কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে আর না সিদ্ধান্তে আসার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে।
ঘাসের ওপর বসে পড়ল মিলান। একটুক্ষণ বসে থেকে সেখানেই শুয়ে পড়ল সে। মাহদীকে নিয়ে আর ভাবার কিছু নেই। সে এখন একজন মিলান, এটাই বড় কথা। মাহদী একটি ডায়েরি মাত্র। মিলান ডায়েরিটা তার প্রিয় বুকশেলফের কোথাও লুকিয়ে রাখবে। এখন চারপাশে কী হচ্ছে আর কী হতে চলেছে সেদিকেই মনোযোগ রাখা উচিত। মিলান এখন কী করবে তা-ই তার ভাবা উচিত। মিলানের চোখ বুজে এলো। এতসব চিন্তা আর দুশ্চিন্তা নিয়ে জীবনকে উপভোগ করা যায় না। আ, হয়তো উপভোগ করা যায়, কিন্তু এমন জীবন একটা অনর্থ। মিলান অনুভব করল, তার পাশে এসে কেউ শুয়েছে। চোখ খুলল মিলান। কিন্তু আশ্চর্য!
-মানে?
সে কাউকে দেখতে পেল না।
-তুমি দেখতে পেয়েছিলে?
নাহ।
-তবে জানলে কীভাবে?’
আরে, ওটা আমিই ছিলাম। তবে আমাকে আমিও দেখছিলাম না। শুধু ভাবছিলাম যে, আমি এখন মিলানের পাশে। আর তার পাশে আমি শুয়েছি। তো মিলান চোখ খুলে আমার দিলে তাকাল, কিন্তু ভাব দেখে মনে হলো, আমাকে দেখতে পেল না সে। (চলবে)

মাই নিউজ/মাহদী

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   ব্রেকিং: বরাকাহ পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের ইউনিট 1 এর নিরাপদ স্টার্ট-আপ সফলতা অর্জন করেছে   ❖   এবার হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করল যুক্তরাজ্য   ❖   রিজেন্টর চেয়ারম্যান সাহেদ গ্রেফতার   ❖   কাল থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে আরব আমিরাতের মসজিদ   ❖   এডিআইও আবুধাবিতে স্টার্টআপের তহবিলের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর জন্য শোরুক পার্টনার্স বেদায়া তহবিলে বিনিয়োগ করেছে   ❖   বাইতুল মোকাররমের খতিব হতে পারেন মাওলানা হাসান জামিল সাহেব!   ❖   ভারতীয় একজন কিডনী ব্যর্থতায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, তুমি নিরাপদ হাতে রয়েছ   ❖   উচ্চ আদালতের স্থিতিবস্থা জারির পরও ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে রাজধানীর একটি মসজিদ   ❖   করোনাকালে ক্বওমী মাদরাসাগুলোর ১২ চ্যালেঞ্জ   ❖   চাকরিচ্যুৎ সেই ইমামকে স্বপদে বহাল করতে লিগ্যাল নোটিস