All for Joomla The Word of Web Design
গল্প

রাস্তার ছেলে

মুহাম্মাদ নাইম আল-ইসলাম সজীব

সেদিন বেশ তাড়াহুড়ো করেই বাড়িতে ফিরছিলাম। ক্ষণিক দেরি হয়ে গিয়েছিল রোহানদের বাড়ি থেকে ফিরতে। গণিতের নোটটি আনতে গিয়েই যত প্যারার স্বীকার। রোহানের আম্মু একেবারে নাছোড়বান্দা। নাস্তা খেয়ে উদর মুবারক পুরাবার আগে উঠতেই দিচ্ছেন না। যাক, শেষমেশ একটা বুঝ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। তবুও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাসায় গেলে নির্ঘাত আম্মু বকাঝকা হজম করতে হবে। কিন্তু কী করার, উপায় তো ছিল না? না খেলে যে আন্টি মন খারাপ করতো। ভাবনার জগতে এগুলোর মাঝে বিচরণ করতে করতে কিছুদূর এগোলাম। হঠাৎ দেখি রাস্তার পাশে ডাস্টবিন থেকে একটা দশ-বারো বছরের ছোট্ট ছেলে কিছু একটা কুড়িয়ে নিয়ে খাচ্ছে। মনের মাঝে কোথায় যেন একটা খোঁচা লাগলো। কেন জানি ওর জন্য আমার বেশ দরদ লেগে উঠলো। “আরে এতো আমার ছোটো ভাইয়ের বয়েসী হবে।”
একপা সামনে অগ্রসর হয়ে আবার পিছু হটলাম। কিন্তু এই ভেবে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না যে, “ও যদি আমার ভাই হতো, তাহলে অন্য কেউ হয়তো ওকে এভাবে এড়িয়ে যেত!”
ছেলেটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। দেখলাম, ও একটা বাসি শুকনো রুটি চিবোচ্ছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে একবারের জন্য পেছনে ফিরে আমার চোখে চোখ রেখে একটা মুচকি হাসি হেসে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হলো। সত্যি! ওর সাধু সুলভ খাওয়াটা আমার হৃদয় ছেঁদো করে দিচ্ছিলো।
শক্ত-শুষ্ক রুটিটা আরেকটু বাকি আছে। আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না রুটিটা টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম রাস্তায়। ছেলেটা আমার দিকে অশ্রু টলমল চোখে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর করুণ সুরে বলে উঠলো, “সাহেব, এইডা ফালাই দিলেন? সকালেত্যে কিচ্ছু খাই নি। জানেন, আমার ছোডো ভাইডাও উপাস আছে। ভাইবলাম, ওর জইন্য এইটুক লইয়া যামু। কিন্তু আপনি ফালাই দিলেন?”
” হ্যাঁ ফেলে দিলাম। তো কী হয়েছে?” আমি কান্না গলায় আটকে তাকে বললাম, খানিকটা অভিমানী স্বরে।
” না সাহেব কিচ্ছু হয় নি। আইচ্চা আহি।” বলে ও চোখ মুছতে মুছতে হাঁটা ধরলো।
” দাঁড়া! তোর নাম কী?”
” আমার নাম? আমার নাম ফয়েজ।”
” এই ছেলে তুই স্কুলে যাস না?”
” হ্যাঁগো, আগে যাইতাম কিন্তু এহন যাই না।”
” কেন রে?”
” আমার তো কেও নাই। কে পারাইবো আমারে?”
” কেন তোর বাবা-মা?”
” ছিলো তো। পাঁচ বছর আগে আব্বায় মইরা গেছে। আর কয়দিন আগে জ্বরে আম্মায়ও মইরা গেছে। এহন আমার ছোডো ভাইডা ছারা আর কেও নাই। এইতো সামনের বস্তিডায় আমরা দুজনে থাহি। বস্তির মহাজনে কইছে টাহা না দিলে এহানেত্যে বাইর কইরা দিবো। কিন্তু সাহেব আমি ত খাইতে পারি না, তাইলে টাহা কুথায় পামু?
আইচ্চা সাহেব আইজকা তাইলে আহি, কাইল আইলে কতা কমু, এহন আমারে ছোডো ভাইডার জইন্য খানা খুঁইজত অইবো।”
“দাঁড়ানা।” কান্নায় গলা জড়িয়ে যাচ্ছিলো আমার। পকেট থেকে এক হপ্তার টিফটিফিনের সব টাকা বের করে ওর হাতে গুঁজে দিলাম। বাকহীনভাবে ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
” এটা দিয়ে আজ দুজনের সাহেবি খানা হবে তো?” বলে আমি হাঁটা ধরলাম। মনে মনে ভাবলাম আম্মুর কাছে কাল কী করে টাকা চাইবো? সবে হপ্তা দুদিনও ঘুরে নি। আবার, কুরানে স্রষ্টার বাণীসমূহ স্মরণ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। একপা দুপা করে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম।

বাসার দরজার সামনে গিয়ে কলিং বেলের মধ্যে হাত রাখতে আওয়াজ হলো। বিকট আওয়াজ। আমি সজাগ হলাম। দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে আম্মু বলে উঠলো: কিরে এখন বুঝি তোর আসার সময় হলো?
” না আম্মু রোহানদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, নোটের জন্য।”
” আচ্ছা হলো, এখন ভেতরে আয়।” আম্মু মন ভালো মনে হলো আজ। না হয় এতো সহজে পার পেতাম না।
ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, খাওয়া দাওয়া সারলাম। তারপর যথারীতি রুটিন মতো নিজের কাজগুলো করলাম। মনের মাঝে শুধু একটা আকাঙ্ক্ষাই উঁকি মারে যে, কখন কাল আসবে।

সকালের নাস্তা সেরে স্কুলের উদ্দেশে বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে ডাস্টবিনটার কাছে এলাম। কিন্তু ছেলেটাকে আশপাশে কোথাও দেখতে পেলাম না। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি আরো এক ঘণ্টা বাকি আছে ক্লাসের। তাই মনকে স্থির রাখতে পারলাম না; “ছেলেটাকে একটু দেখে আসি।”
হাঁটা ধরলাম বস্তির দিক। পথে একটা লোককে জিগ্যেস করলাম, “ফয়েজদের ঘর কোথায়?”
” কে? এতিম ছেলেদুটো?”
” হ্যাঁ। চাচা।”
” ওদেরতো মহাজন কাল বিকেলেই ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।” তার কথায় আমার মাথায় যেন আসমান ভেঙ্গে পড়লো।
” কী বলেন? ওরা এখন কোথায়?”
” জানি না। দেখলাম দুজনে কাঁদতে কাঁদতে বস্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।”
আমার কান্না আর চেপে রাখতে পারলাম না। গলা ফেটে হু হু করে কান্না এসে গেল। নিজের অজান্তেই যেন, চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলাম। ছেলেটার হাবা দৃষ্টি আমার অন্তরে তীরের মতো গেঁথে আছে। আফসোস! কাল যদি ওকে বাসায় নিয়ে যেতাম তাহলেতো এমনটি হতো না। হয়তো আমার একটু কষ্ট হতো। কিন্তু তাতে কী আসে যায়। দুজনে কষ্টটা ভাগাভাগি করে নিতাম। কিন্তু এখন তাদের কী হবে ওদের? হায় আল্লাহ্! কী যে ভুল করলাম আমি।

০ Comments

Leave a Comment

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

শিরোনাম:
  ❖   লালমনিরহাটের গণপিটুনি ও পুড়িয়ে হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে: ইশা ছাত্র আন্দোলন, ঢাবি শাখা   ❖   কওমী শিক্ষার্থীদের জাতির উন্নয়নের অগ্রদূত হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে হবে: মুফতি শেখ মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম   ❖   ‘হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর শিক্ষা সমগ্র মানব জাতির জন্য অনুসরণীয়’- রাষ্ট্রপতি   ❖   ফরাসিদের সাজা দেয়ার অধিকার মুসলমানদের আছে: মাহাথির   ❖   ফ্রান্স ইস্যুতে নিরপেক্ষ থাকবে বাংলাদেশ   ❖   ইসলাম অবমাননাকর কার্টুন প্রকাশে নিন্দা রাশিয়ার   ❖   অফিসে ধর্মীয় পোশাক, নোটিশ প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ   ❖   মাসে ৭০ হাজার টাকা ভাড়ায় অফিস নিল “গন অধিকার পরিষদ”   ❖   সিনামা-নাটকে বিয়ের দৃশ্যে ‘কবুল’ বলা যাবে না!   ❖   নারীদের হিজাব, পুরুষের টাকনুর ওপর পোশাক পরে অফিসে আসার নির্দেশ